বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের নতুন মোড়কে পুরনো বিষ

সম্পাদকীয়

ডিসেম্বরের ঢাকা যেন এক অদ্ভুত শহর। দিনের আলোতে মানুষ অফিসে যায়, সন্ধ্যায় বাসায় ফেরে। কিন্তু এই স্বাভাবিকতার পর্দার আড়ালে যে অস্বাভাবিকতা বাসা বেঁধেছে, তা বুঝতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একবার চোখ বোলালেই যথেষ্ট। সামাজিক মাধ্যমে চলছে ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে আগামী দিনে যুদ্ধ ঘোষণা করার আগের পরিকল্পনার চুলচেরা বিশ্লেষণ, অন্যদিকে যে কোনো বিরোধী স্বরকে আবার ‘ফ্যাসিস্ট’ বলে চিহ্নিত করে দেওয়াও জোর কদমে চলছে। 

এরই মধ্যে ঢাকা জ্বলে উঠছে। ময়মনসিং জ্বলে উঠছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের রক্ত ও রূহ জ্বলে উঠছে না। 

রক্তাক্ত ডিসেম্বর: একটি হত্যা, অনেক প্রতিক্রিয়া

গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকায় মোটরসাইকেল আরোহী বন্দুকধারীরা গুলি করে ইসলামী কট্টরপন্থী সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদিকে। ছয় দিন পর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ১৮ ডিসেম্বর মারা যান। তাঁর মৃত্যু যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করল, তা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন।

সারা দেশে দুই দিনের হরতাল হলো। বিক্ষোভ হলো। কিন্তু বিক্ষোভ যখন সহিংসতায় রূপ নিল, তখন লক্ষ্যবস্তু হলো সংবাদপত্র অফিস, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, আর নিরপরাধ মানুষ। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের অফিসে আগুন জ্বালানো হলো। ঢাকার রাজপথে ধ্বংসযজ্ঞ চলল। আর ময়মনসিংহের ভুলুকায় ঘটল সবচেয়ে নৃশংস ঘটনা।

দীপু চন্দ্র দাস। বয়স তেইশ। পেশায় গার্মেন্টস শ্রমিক। ধর্মে হিন্দু। এটুকুই তাঁর ‘অপরাধ’ ছিল। ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগে জনতা তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করল। তারপর গাছে ঝুলিয়ে তাঁর লাশকে পুড়িয়ে দিল—যেন একটা বার্তা। মবের বার্তাটা স্পষ্ট, বাংলাদেশে কিছু মানুষের জীবনের দাম নেই।

দাসের নাম ধর্ম অবমাননা করার অভিযোগ উঠলেও দেখা গেছে মূলত কারখানায় উৎপাদনের লক্ষ্য মাত্রা স্থির করা ও বেতনের হার নিয়ে তাঁর সাথে মালিকপক্ষের বিবাদ চলছিল। এই বিবাদ থেকেই তাঁর হত্যার ইন্ধন দিয়েছে মালিকপক্ষ বলে অভিযোগ। 

এরই সাথে অভিযোগ পাইওনিয়ার নীটওয়্যার কোম্পানির মালিকপক্ষ মিথ্যা অভিযোগ করেছিল যে দাস নাকি ইসলামের মুহাম্মদের নাম কটূক্তি করেছে। 

যদিও সরকার ১২ জনকে গ্রেফতার করেছে, এই যে সরাসরি যে কোনো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে তাকে হিংস্র মবের হাতে তুলে দেওয়া যায়, খুন করানো যায়, সেই খুনের ভিডিও গর্ব করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, সেই ভয়াবহ বাস্তবতাকে পরিবর্তন করার কোনো পদক্ষেপ পশ্চিমা-বান্ধব অন্তর্বর্তী সরকার করেনি। 

জঙ্গিবাদের পুনরুত্থান: সংখ্যা যা বলছে

সিঙ্গাপুরের রাজারত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (আরএসআইএস)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন পড়লে ঘুম হারাম হওয়ার কথা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের কারাগার থেকে হাজারেরও বেশি বন্দি পালিয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত ৭০ জন সশস্ত্র জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত।

শুধু পলায়ন নয়। এই বিশৃঙ্খলায় প্রায় ৫,৮০০টি অস্ত্র ও লক্ষাধিক গোলাবারুদ লুট হয়েছে। এই অস্ত্র কোথায় গেছে? কার হাতে আছে? উত্তর কেউ জানে না। অথবা জানলেও বলছে না।

আরও উদ্বেগের বিষয়, তিনশোরও বেশি সন্ত্রাসী সন্দেহভাজনকে জামিনে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে আছে জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি) ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) সদস্যরা। এবিটির মূল হোতা হিসেবে অভিযুক্ত মুফতি জসিমউদ্দিন রহমানি এখন দাবি করছেন, তাঁর সংগঠনের কোনো অস্তিত্বই নেই। কী চমৎকার অস্বীকার!

পতাকা আর প্রতীক: যা চোখে পড়ছে

ঢাকার বিক্ষোভে গত দেড় বছরে যা দেখা গেছে, তা স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রতিবাদ নয়। আইএস (ইসলামিক স্টেট) ও আল-কায়েদার কালো পতাকা উড়েছে। ওসামা বিন লাদেনের ছবি বহন করা হয়েছে। এগুলো দেখে কেউ যদি ভাবেন এটা ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’, তাহলে তিনি হয় অন্ধ, নয় ইচ্ছাকৃতভাবে চোখ বন্ধ রাখছেন।

আরএসআইএস রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, পাকিস্তান-ভিত্তিক তেহরিক-ই-তালেবান (টিটিপি) বাংলাদেশি তরুণদের নিয়োগ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। অনলাইনে তাদের প্রচারণা চলছে। তরুণ মনে বিষ ঢালা হচ্ছে। এই কাজে যুক্ত তুর্কির সরকারের পৃষ্টপোষকতায় শক্তিশালী হয়ে ওঠা ইসলামী জঙ্গিবাদী শক্তিও। আর অন্তর্বর্তী সরকার দেখছে, কিন্তু দেখেও দেখছি না।

হেফাজত থেকে রাজনীতি: একটি বিপজ্জনক সমীকরণ

সবচেয়ে উদ্বেগজনক সংবাদ হলো, হেফাজত-ই-ইসলামসহ বিভিন্ন উগ্রপন্থী গোষ্ঠী এখন নির্বাচনে অংশ নিতে চাইছে। তারা নির্বাচনী সমঝোতার পথ খুঁজছে। ২০২৬ সালের নির্বাচন তাদের লক্ষ্য। এই হেফাজত কে একদিন গড়ে পিটে তৈরি করেছিলেন শেখ হাসিনা। তাঁর আমলে সরকারি প্রশ্রয়ে বেড়ে ওঠা ইসলামী জঙ্গিরা আজ আরও উন্মুক্ত হয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক নকশার থেকে গণতান্ত্রিক অবশিষ্টটুকু মিটিয়ে দিতে চাইছে।  

এটা শুধু রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ নয়। এটা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটা মৌলিক প্রশ্ন। যারা গণতন্ত্রকে ‘কুফরি’ মনে করে, তারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিলে কী হবে? উত্তর সহজ: তারা গণতন্ত্রকে ব্যবহার করবে গণতন্ত্র ধ্বংস করতে।

নারী অধিকার কর্মী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, আর ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীরা ইতিমধ্যে উদ্বিগ্ন। তাঁদের উদ্বেগ অমূলক নয়। যে দেশে একজন তরুণ শ্রমিককে শুধু তাঁর ধর্মের জন্য গণপিটুনিতে হত্যা করা যায়, সে দেশে কেউই নিরাপদ নয়।

সরকারের প্রতিক্রিয়া: কথা অনেক, কাজ কম

অন্তর্বর্তী সরকার বিবৃতি দিয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘কিছু চরমপন্থী গোষ্ঠী’ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। তিনি শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, অপরাধীদের বিচার হবে।

কিন্তু প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার মধ্যে যোজন যোজন ফারাক। দীপু চন্দ্র দাসের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার হয়েছে কজন? সংবাদপত্র অফিসে হামলাকারীদের শাস্তি হয়েছে কার? জঙ্গি সন্দেহভাজনদের জামিন দেওয়া কি বন্ধ হয়েছে?

বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ দীপুর হত্যাকে ‘নৃশংস’ বলে নিন্দা জানিয়েছে। কঠোরতম শাস্তি দাবি করেছে। কিন্তু দাবি আর বাস্তবায়ন এক জিনিস নয়। এই দেশে দাবি করা সহজ, ন্যায়বিচার পাওয়া কঠিন।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: বাইরের চোখে বাংলাদেশ

ভারত ক্ষুব্ধ। নয়াদিল্লি বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে। ভারতীয় মিশনের সামনে বিক্ষোভের প্রতিবাদ জানিয়েছে। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক টানাপড়েনে।

কিন্তু এখানে একটা প্রশ্ন আছে। ভারত যখন প্রতিবাদ করছে, তখন কি সে শুধু ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন, নাকি নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ দেখছে? উত্তর জটিল। কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার—বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা এখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে চলে গেছে। এটা লজ্জার, লুকানোর কিছু নেই। আর বাংলাদেশে যে নব্য ইসলামী জাতীয়তাবাদ মাথা তুলেছে, সব কিছুকেই ফ্যাসিবাদ বলছে, তারাই ভারতের হাতে নিজের দেশকে নাস্তানাবুদ করার অস্ত্র তুলে দিচ্ছে। 

সাংবাদিকতার ওপর আঘাত: সত্যকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা

প্রথম আলো আর ডেইলি স্টারের অফিসে হামলা শুধু দুটো সংবাদপত্রের ওপর আক্রমণ নয়। এটা সত্যের ওপর আক্রমণ। যারা সংবাদপত্র পোড়ায়, তারা আসলে তথ্যকে পোড়াতে চায়। তারা চায় মানুষ অন্ধকারে থাকুক। আর এই কর্মকান্ড তারা করে ফ্যাসিবাদ কে হারানোর নাম করে। কিন্তু নিজেদের সমালোচনা তারা সহ্য করতে পারে না। হাসিনাকে কণ্ঠ অবরোধকারী যারা বলে, তারাই আজ অন্যের কণ্ঠরোধ করতে উদ্ধত হয়েছে। 

একজন সাংবাদিককে যখন ভয় দেখানো হয়, তখন হাজার হাজার পাঠক সত্য থেকে বঞ্চিত হয়। একটা সংবাদপত্র অফিস যখন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, তখন গণতন্ত্রের একটা স্তম্ভ ভেঙে পড়ে। এটা বোঝার জন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিএইচডি লাগে না। আর এই কর্মকান্ড যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষিত যুবরা সমর্থন করছে তখন বোঝা যায় যে তারা সব জেনেশুনেও নব্য ফ্যাসিবাদকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। 

ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে: কী করণীয়?

আইন ও সালিশ কেন্দ্র সতর্ক করে দিয়েছে, এই সহিংসতা রোধ না করলে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের জন্য স্থায়ী সংকট তৈরি হবে। কথাটা কঠিন, কিন্তু সত্য।

বাংলাদেশের সামনে এখন কয়েকটা কাজ। প্রথমত, জঙ্গি সন্দেহভাজনদের নির্বিচারে জামিন দেওয়া বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে। তৃতীয়ত, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে—শুধু কাগজে নয়, বাস্তবে। চতুর্থত, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের সুরক্ষা দিতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, রাজনৈতিক দলগুলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তারা কি উগ্রপন্থীদের সঙ্গে হাত মেলাবে, নাকি গণতন্ত্রকে বাঁচাবে? দুটো একসঙ্গে হয় না। 

২০২৪ সালের বর্ষা অভ্যুথানের পরবর্তী কালে এই উগ্র ইসলামী শক্তির দাপট দেখেই কিন্তু বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী পার্টি (বিএনপি) ও বামেরা সংবিধান ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কে বাঁচানোর প্রচেষ্টা তীব্র করে। যদিও জামাত-এ-ইসলামী একদা বিএনপি-র ঘাড়ে চেপে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে হাত পাকিয়েছিল, ২০২৪ সালের পরে তারা বিএনপিকে ছুড়ে ফেলে দেয়। 

শেষ কথা: ‘বাংলাদেশ’ কি থাকবে?

বাংলাদেশের অস্তিত্ব নির্ভর করছে দুই শক্তির বিরুদ্ধে সে কী ভাবে সংগ্রাম করে টিকে থাকে। একদিকে রয়েছে ভারতীয় সমর্থনপুষ্ট আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগীদের দেশটিকে নয়াদিল্লির একটি উপনিবেশ হিসাবে বেঁধে রাখার প্রচেষ্টা। অন্যদিকে রয়েছে ইসলামী জঙ্গিদের দেশের স্বাধীনতাকে পশ্চিমা শক্তির কাছে বিকিয়ে দিয়ে, সিরিয়ার আহমদ আল-শারা’র নেতৃত্বাধীন হায়াৎ আল শামস এর আদলে একটি পুতুল সরকার বানিয়ে বাংলাদেশ কে অভ্যন্তরীণ ভাবে দুর্বল করে দেওয়ার প্রচেষ্টা। 

এই দুটো শক্তির বর্তমান মুখ ও মুখোশগুলো হয়তো একদিন ইতিহাস থেকে মুছে যাবে। হয়তো মানুষ ভুলে যাবে এরা কারা ছিল। কিন্তু সেই দিন আসবে তখনই, যখন এই শক্তিগুলোকে পরাস্ত করে একটি নতুন বাংলাদেশ সকল ধর্মের ও জাতির মানুষ গঠন করতে পারবে।

যতদিন তরুণরা জঙ্গি মতাদর্শে প্রলুব্ধ হবে, যতদিন সংখ্যালঘুরা ভয়ে থাকবে, যতদিন সাংবাদিকরা হুমকিতে থাকবে—ততদিন এই দুটি শক্তি বেঁচে থাকবে। প্রশ্ন হলো— বাংলাদেশ কি এই বাস্তবতা মেনে নেবে, নাকি বদলাবে?

উত্তর আমাদের হাতে। সময় বেশি নেই।


তথ্যসূত্র: রয়টার্স, আল জাজিরা, আরএসআইএস রিপোর্ট, বাংলাদেশ সরকারের বিবৃতি ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যম

এই প্রবন্ধটি কি আপনার ভাল লেগেছে?

তাহলে মাত্র ৫০০ ভারতীয় টাকার থেকে শুরু করে আপনার সাধ্য মতন এই ব্লগটি কে সহযোগিতা করুন

যেহেতু আমরা FCRA-তে পঞ্জীকৃত নই, অতএব ভারতের বাইরের থেকে সহযোগিতা আমাদের পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব নয়।


Leave a Reply

CAPTCHA