বিহার নির্বাচন ২০২৫: কেন বিজেপি নেতার ফুলকপি চাষের হুমকি পোস্ট স্ববিরোধিতায় ভরা?
বিহারের বিধানসভা নির্বাচনে ব্যাপক ভোটে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট (এনডিএ) বিজয় লাভ করার পর থেকে বিরোধী শিবিরে ত্রাহি ত্রাহি রব। মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারের জনতা দল (ইউনাইটেড) বা জেডিইউ যদিও গত বিধানসভা নির্বাচনের মতন এবারেও বিজেপির থেকে কম আসন পেয়েছে, তবুও যেহেতু নয়া দিল্লীতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি তাঁর ও চন্দ্র বাবু নাইডুর তেলুগু দেশম পার্টির সমর্থনের উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে তাই তিনি আগের থেকে সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছেন। যদিও বিরোধী জোট (ইন্ডিয়া), যা একদা কুমার নিজে উদ্যোগ নিয়ে তৈরি করেছিলেন, বিজেপির ক্ষমতায় ফেরার সাথে বিহারে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও হিংসা বৃদ্ধির আশংকা করছে, তাদের বেশির ভাগ দলই বিহারের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পিছনে নিজেদের জোটসঙ্গীদের ভূমিকাকে আড়াল করে রাখছে, যা এককালে বিজেপিকে সুবিধা করে দিয়েছিল।
বামপন্থী দলগুলো, যেমন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিআই), সিপিআই (মার্কসবাদী) [সিপিআই (এম)], সিপিআই (মার্কসবাদী – লেনিনবাদী লিবারেশন) [সিপিআই (এম-এল লিবারেশন)], বাদে অন্য কোনো শক্তি বিজেপির সাম্প্রদায়িক, ইসলাম বিদ্বেষী রাজনীতির বিরুদ্ধে বিহার নির্বাচনে নীতিগত ভাবে লড়াই করেনি। আবার এই লড়াইয়ে সিপিআই (এম) ও সিপিআই (এম-এল লিবারেশন) কে অনেক ক্ষেত্রে পুরানো প্রতিদ্বন্দ্বী লালু প্রসাদ যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দলের (আরজেডি) সাথে আপস করতে হয়েছে সাম্প্রদায়িক বিজেপিকে হারানোর জন্যে।
বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের বিজয়ের পরেই গেরুয়া শিবির তীব্র ইসলাম বিদ্বেষী উল্লাস প্রকাশ করে, আর তার মধ্যে দিয়ে বিহারের জটিল রাজনৈতিক সমীকরণের জন্যে কিছু অমীমাংসিত প্রশ্নও তুলে ধরে।
অসমের বিজেপি সরকারের মন্ত্রী অশোক সিঙ্ঘল তাঁর সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্ম এক্স (অতীতে টুইটার) হ্যান্ডেল থেকে ফুলকপি চাষের ছবি দিয়ে লেখেন যে বিহার কপি চাষের পক্ষে ভোট দিয়েছে।
Bihar approves Gobi farming ✅ pic.twitter.com/SubrTQ0Mu5
— Ashok Singhal (@TheAshokSinghal) November 14, 2025
এই পোস্টের মাধ্যমে সিঙ্ঘল সূক্ষ ভাবে ইঙ্গিত করেছেন ১৯৮৯ সালের ভয়াবহ ভাগলপুর দাঙ্গার দিকে।
২৭শে অক্টোবর ১৯৮৯ এ, বিজেপির দ্বারা সমর্থিত দুষ্কৃতীরা ভাগলপুর থেকে ২০ মাইল দূরের লোগাঁয়তে, তৎকালীন এক দারোগার সাহায্যে, ৫৫ জন পুরুষ ও ৬১ জন নারীকে কুপিয়ে খুন করে পুকুরে ফেলে দেয়।
পরে, প্রমাণ লোপাট করতে, পুলিশ ও দুষ্কৃতীরা পুকুর থেকে লাশ তুলে তা পার্শ্ববর্তী কৃষি জমিতে পুঁতে দেয় ও স্থানীয় কৈরি সম্প্রদায়ের কৃষি শ্রমিকদের দিয়ে সেই জমিতে ফুলকপি ও সর্ষের বীজ রোপণ করে।
শীতের চাষের জমির নিচে তখন পচনশীল লাশগুলো কৃষির সারের কাজ করছিল বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন।
যদিও বর্তমানে অসমের বিজেপি মন্ত্রী কপি চাষের ছবি দিয়ে সেই ভয়াবহ গণহত্যার স্মৃতিকে উস্কে দিচ্ছেন, তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হলো যে সেই ঘটনার জন্যে যে রাজনৈতিক ব্যক্তি দায়ী ছিলেন তিনি বিজেপির ঘোর বিরোধী, আরজেডি প্রতিষ্ঠাতা ও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী লালু যাদবের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ, স্বজাতির নেতা, কামেশ্বর যাদব।
সেই দাঙ্গায় মুসলিম পক্ষ কে টাকা দিয়ে সমর্থন করেছিল কংগ্রেসের তৎকালীন নেতা ও সাংসদ ভাগবত ঝাঁ আজাদ।
আজাদ একজন উচ্চ জাতির হিন্দু ছিলেন। আর বিহারের সেই ভয়াবহ মুসলিম গণহত্যায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে পিছিয়ে থাকা শ্রেণীর (ওবিসি) যাদবেরা।
ভাগলপুরের মুসলিম গণহত্যার এই সামাজিক সমীকরণ পরবর্তী কালে বিহারের রাজনীতির সমীকরণও বদলে দেয়।
এর পরে আর কোনোদিন বিহারে কংগ্রেস একক শক্তিতে নির্বাচনে বিজয়ী হয়নি। অন্যদিকে, লালু প্রসাদ যাদব চিরকাল ধর্মনিরপেক্ষতার বুলি আউরেও, বিজেপির বাবরি মসজিদ ভাঙার প্রাক্কালে লাল কৃষ্ণ আদবানির রথ যাত্রা আটকে তাঁকে গ্রেফতার করার সাহস দেখালেও, যার কারণে মনে করা হয় তিনি নিজের যাদব সম্প্রদায়ের সাথে মুসলিম ভোটকেও কুক্ষিগত করতে পেরেছিলেন বিহারে, তিনিই কিন্তু কামেশ্বর যাদব কে ভাগলপুর গণহত্যার পরে ক্ষমতায় এসে উষ্ণ আলিঙ্গন করেছিলেন, তাঁর স্তুতি করেছিলেন।
লালু প্রসাদ যাদব ও তাঁর স্ত্রী রাবড়ি দেবীর শাসনকালে, ২০০৫ পর্যন্ত, বিহার সরকার কোনো ভাবেই ভাগলপুর মুসলিম গণহত্যার কোনো নিরপেক্ষ তদন্ত করেনি। বরং, বিজেপির সাহায্যে ক্ষমতায় এসে কুমারই এই ঘটনার তদন্ত শুরু করান, এবং তাঁর আমলেই, প্রায় দুই দশক পরে এই অপরাধের কারণে ঘটনায় যুক্ত পুলিশকর্মী সহ অনেক দোষী শাস্তি পায়।
সিঙ্ঘল একাই নন। ফুলকপির ছবি দিয়ে ভাগলপুরের মুসলিম বিজেপি আগেও করেছে। ২০২৫ সালের মে মাসে কর্ণাটক বিজেপির এক্স হ্যান্ডেল থেকে ইউনিয়ন গৃহমন্ত্রী অমিত শাহের একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বানানো ছবি পোস্ট করা হয়।
ছবিটিতে শাহকে একটি ফুলকপি হাতে একটি কবরের ফলকের পাশে দাঁড়াতে দেখা যায় যাতে লেখা আছে “NAXALISM Rest In Peace”।
"Lol" Salaam, Comrade!! https://t.co/WkzYoHIOUQ pic.twitter.com/ngYyVKYCll
— BJP Karnataka (@BJP4Karnataka) May 23, 2025
এই পোস্টটি তৎকালীন সময়ে ভারতে নিষিদ্ধ সিপিআই (মাওবাদী) দলের বিরাট সংখ্যক কর্মী ও নেতার সশস্ত্র সংঘর্ষে নিহত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে করা হয়েছিল।
ইঙ্গিতটি তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। নকশালপন্থীদের ভবিষ্যতও ভাগলপুরের মুসলিমদের মতন হবে — এই ইঙ্গিত করা ছিল।
এর আগে, এই বছরের মার্চ মাসেই নাগপুরে মুসলিম বিদ্বেষী হিংসার সময়ে নানা ধরণের হিন্দুত্ববাদী ব্যক্তির হ্যান্ডেল থেকে এক্স প্ল্যাটফর্মে ফুলকপি চাষের ছবি পোস্ট করে গণহত্যার পক্ষে প্রচার করতে দেখা গেছে।
যদিও সিঙ্ঘল এই ধারাতে প্রবাহিত হয়েই তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে এই ফুলকপি চাষের পোস্ট দেন, কিন্তু সেটা করার সময় তাঁর হয়তো খেয়াল ছিল না যে বিহারের নির্বাচনে বিজেপি ও এনডিএ-র প্রধান প্রতিপক্ষ আরজেডি-র প্রতিষ্ঠাতা নিজেই এই ফুলকপি কাণ্ডের পান্ডাদের সহযোগী ছিলেন। সিঙ্ঘল আরও উপেক্ষা করে গেছেন যে — আরজেডিকে শুধু বিহারের মুসলিম ভোটাররাই নয়, বরং যাদব সম্প্রদায়ও ভোট দেয়। সেই যাদব সম্প্রদায় যা ভাগলপুর মুসলিম গণহত্যার সময়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল হিন্দুত্ববাদী শক্তির পক্ষে এবং সেই ঘটনার দোষীদের আসলে লালু প্রসাদ যাদবই তাঁর শাসনকালে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন আইনের হাত থেকে।
এ ছাড়াও সিঙ্ঘল ও ফুলকপি চাষ নিয়ে অতি উৎসাহী বিজেপির নানা নেতা ও কর্মীরা আরও ভুলে গেছেন যে তাঁদের জোট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হয়ে কুমারই এই মুসলিম গণহত্যার দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিলেন।
ফলে বিজেপির কর্মী ও নেতাদের ফুলকপি নিয়ে অতি উৎসাহ দলটির নিজস্ব ইতিহাস ও বিহারের রাজনীতি নিয়ে তাদের জ্ঞানের অভাবকেই প্রকট করে।
আর নিজেদের জোট কে রক্ষা করার স্বার্থে এই স্ববিরোধিতা কে সামনে এনে বিজেপিকে আরও বিব্রত না করে বামপন্থী সিপিআই, সিপিআই (এম), সিপিআই (এম-এল লিবারেশন), প্রভৃতি কিন্তু আদতে হিন্দুত্ববাদী শক্তিরই অজান্তে সহযোগিতা করে ফেলছে।

