১) বাজারী শঙ্কা

আনন্দবাজার শঙ্কিত। কোরোনার কামড় খেয়ে ‘চেনা পুঁজিবাদ‘এর উপর আস্থা হারিয়েছেন বাজার অর্থনীতির পশ্চিমবঙ্গ শাখার অতন্দ্র প্রহরী, অন্তত সম্প্রতি প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে সেরকমটা মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। অবশ্য ইতিহাসে শেষ ঘোষণা করা পুঁজিবাদের নয়নের মণি ফুকুয়ামা যখন ঢোক গিলে সোসালিজমের কথা বলে ফেলেন তখন এরকম আনন্দময় পাল্টি অস্বাভাবিক কিছুই নয়। তবে পাল্টি ওই ‘চেনা পুঁজিবাদ‘ থেকেই, তার একটুও বেশি নয়।

আবাপ তে গত আটই এপ্রিল যে প্রবন্ধটিতে ‘অন্য‘ পথে চলার আহ্বান রেখেছেন তাকে একটু গোছালে যা দাঁড়ায় তা সুবিধার জন্য পয়েন্ট করে লেখা হল।

১)বিশ্বায়নের ফলে অবাধ মানুষ ও পণ্য চলাচল কোরোনার অতিমারী হয়ে ওঠার পিছনে দায়ী।

২)আমেরিকায় স্বাস্থ্যব্যবস্থার হুলিয়ে বেসরকারীকরণ ও ইউরোপের অতিরিক্ত ব্যক্তিস্বাধীনতার জন্য কোরোনার উপর লাগাম টানতে পারছে না।

৩)প্রথমদিকে নয়া উদারবাদী অর্থনীতি ভালো হলেও পরে বাজারের খপ্পরে পড়ে উচ্ছন্নে গেছে। এবং পরিবেশ ধ্বংস ও আম জনতার আয় সঙ্কুচিত করার মাধ্যমে এক সঙ্কটময় পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে।

৪) এবং অবশ্যই এই পরিস্থিতিতে যে অর্থনৈতিক মন্দা আসতে চলেছে তাকে মোকাবিলার করার ক্ষমতা এই ব্যবস্থার নেই।

চেনা পুঁজিবাদের বিরোধী হলেও প্রবন্ধটির সমাধান সেই থোড় বড়ি খাড়া। পরিবেশ বাঁচান, গরীবের হাতে টাকা দিন এবং গ্রীন ক্যাপিটালিজম। অবশ্য চক্ষুলজ্জার খাতিরে জনস্বাস্থ্যের কথাটা বলেছেন বটে।

২) পুঁজিবাদের সংকট ও মার্ক্সবাদ

বস্তুবাদী দ্বন্দ্বতত্ত্ব বলে বিশ্বকে বস্তুর যৌগিক সমাহার হিসেবে না দেখে প্রক্রিয়ার সমাহার হিসেবে দেখতে হবে। একদিন দুম করে মন্দা বা কোরোনা দেখে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কঙ্কাল বের হওয়ার পর চমকে লাভ নেই, বরং দেখা উচিত কোন প্রক্রিয়াতে এই সঙ্কট এসে হাজির হচ্ছে।

আজকের যে সঙ্কট, যা আদতে গত দুই শতক জুড়ে যা বারবার ফিরে এসেছে, তার বস্তুগত ভিত্তি পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্কে, যাকে উন্মোচিত করেন মার্ক্স। এই পর্যায়ে এসে পৃথিবী নতুন এক অর্থনৈতিক সঙ্কটের মুখোমুখি হল। এর আগে সমাজে নানা দুর্ভিক্ষ, খরা-বন্যা ইত্যাদি বৃহৎ সমস্যা এসেছে, সেগুলো ছিল খাদ্যদ্রব্য বা আরো উপযোগী সামগ্রী উৎপাদনে অপ্রতুলতার জন্য। কিন্তু এই প্রথম অতি উৎপাদন সমাজের সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিল। এই অতি উৎপাদন অবশ্যই সমাজের চাহিদার নিরিখে নয়, ক্রয় ক্ষমতার নিরিখে। আসলে এই ব্যবস্থায় পুঁজিপতি উৎপাদন করে ভোগের জন্য না, মুনাফার জন্য। ফলে সে মুনাফা বৃদ্ধি করার জন্য ১)শ্রমিকের থেকে উদ্বৃত্তমূল্য বাড়াতে চায় মজুরি কমিয়ে, ২) যন্ত্রপাতির উন্নতি ঘটিয়ে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে চায়। ফলে সমাজে বেকারের সংখ্যা বেড়ে ওঠে, জনগণের ক্রয়ক্ষমতা কমে আসে। অবধারিতভাবে অতিরিক্ত উৎপাদিত দ্রব্য অবিক্রিত হলে মুনাফা কমতে থাকে এবং অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়। এই প্রক্রিয়াটা বৃত্তাকারভাবে চলতে থাকলে অভূতপূর্ব সঙ্কটের সামনে পড়ে বিশ্ব।

পরবর্তীকালে লেনিন দেখান পুঁজিবাদ তার সর্বোচ্চ স্তরে কিভাবে সাম্রাজ্যবাদে পরিণত হয় সস্তার কাঁচামাল, শ্রমিক এবং একচেটিয়া বাজার লাভের উদ্দেশ্যে। ফলে গত শতকে আমরা দেখেছি দুটি বিশ্বযুদ্ধ সহ অসংখ্য ছোট বড় যুদ্ধ, অসংখ্য দুর্ভিক্ষ, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার দেশগুলির ধ্বংসপ্রাপ্তি। এখানে উল্লেখ করা বাহুল্য হবে না, পৃথিবীর সমৃদ্ধতম এলাকা, বাংলা এই যুগে দুটো বৃহৎ দুর্ভিক্ষের শিকার হয় এবং শোষণের ফলে একটি দরিদ্র অংশে পরিণত হয়।এই পুরো পর্যায় জুড়ে অসাম্যের বৃদ্ধি এবং কর্পোরেট হাঙরদের রবরবা বৃদ্ধি অলিখিত নিয়মে এসে দাঁড়ায়।

৯০এর দশকের বিশ্বায়ন আসলে মুমূর্ষু পুঁজিবাদকে চাঙ্গা করার উদ্দেশ্যে এই নির্মম আক্রমণের ধারাবাহিকতা ছাড়া আর কিছুই না। বরং ফাটকা পুঁজির তীব্রতায় প্রথমে আপাত বৃদ্ধি চোখে পড়লেও সেসব সুখস্বপ্ন তাড়াতাড়িই ভেঙে পড়েছে। এক অভূতপূর্ব বৈষম্যের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে বিশ্ব। যেখানে একজন ধনকুবেরের অর্থনৈতিক সম্পত্তি বৃদ্ধি একটি এগারো কোটি মানুষের দেশের স্বাস্থ্যবাজেটের চেয়ে বেশি।

৩) কোরোনা, পরিবেশ সংকট ও মার্কস

কোরোনার কন্সপিরেসি থিয়োরিগুলো বাদ দিলে যেটুকু বোঝা গেছে তা হল ভক্ষণের মধ্য দিয়ে এই ভাইরাস মানবদেহে প্রবেশ করেছে। এর আগেও ইবোলা, নিপাসহ বেশ কিছু ভাইরাস প্রাণীদেহ থেকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। আবার বার্ড ফ্লু, সোয়াইন ফ্লুর মত কিছু রোগও সাম্প্রতিক অতীতে দেখা গেছে । পরিবেশের তোয়াক্কা না করে অতিমুনাফার জন্য ব্যাপকহারে বাণিজ্যিক কারণে খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন মানব সভ্যতার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হাজির করেছে। যাকে নিয়ে ভারত অতি উচ্ছ্বসিত, সেই সবুজ বিপ্লবের পর পঞ্চনদীর দেশ এখন ক্যান্সারের ধাত্রীভূমি। মহারাষ্ট্রে অত্যধিক পরিমাণে আখ তুলো চাষ সেখানে জলের জন্য মারাত্মক সঙ্কট তৈরী করেছে, পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ঋণের দায়ে কৃষকের আত্মহত্যা। নতুন কিছু রিপোর্ট জানাচ্ছে উষ্ণায়নের ফলে বরফ গলে গিয়ে বহুকাল ধরে সুপ্ত ভাইরাসেরা জেগে উঠছে, যার বেশিরভাগটাই বিজ্ঞানীদের কাছে অজানা।

সাম্প্রতিক তথ্য বলছে এখন পৃথিবীতে যত চারণভূমি আছে তার ১/৩ অংশ, যত কৃষিজমি আছে তার ১/৪ অংশ এবং যত বনাঞ্চল আছে তার ১/৪ অংশ তাদের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হারিয়েছে এবং ওই অঞ্চলগুলি থেকে আমরা যে বাস্তুসংস্থানতান্ত্রিক পরিষেবা পেতাম তার মূল্য প্রায় ১৯.৫০ লক্ষ কোটি টাকা। এছাড়া বায়ুদূষণের, জলদূষণের ফলে বিভিন্ন মারন রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

পরিবেশদূষণ নিয়ে গত শতকের সাতের দশকে এসে বিভিন্ন দেশ চিন্তিত হয়, এবং গত পঞ্চাশ বছর ধরে সেই চিন্তার পরিণামে একাধিক ব্যয়বহুল সেমিনার কনফারেন্স প্রভাতফেরী ছাড়া কিছু কাজের কাজ হয়েছে এমন দাবি অতি প্রশংসকেও করবে না। অথচ একশ বছরেরও আগে ‘প্রমিথিউসপন্থী’ বলে দাগী আসামী কার্ল মার্ক্স প্রথম পরিবেশের প্রশ্নটিকে চিহ্নিত করে যান। মানুষ বস্তুগত উৎপাদনের জন্য প্রকৃতির সাথে সংশ্লেষ করে, এবং প্রকৃতিকে ক্ষয়প্রাপ্ত করে। কিন্তু প্রকৃতি নিজের দ্বারাই সেই ক্ষয় মেরামতি করে ফেলে। ফলে একটি জমি আবার চাষযোগ্য হয়ে ওঠে, বা বায়ুমন্ডল আবার আগের স্তরে ফিরে যায়। কিন্তু মুনাফাতাড়িত উৎপাদন ব্যবস্থা নিজের অতিমুনাফার জন্য তীব্র আক্রমণ নামিয়ে আনে প্রকৃতির উপর, এবং প্রকৃতির যে ‘রিপেয়ার’ করার পদ্ধতি তাকে ধ্বংস করে ফেলে। মেটাবোলিক রিফট নামে পরিচিত এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই পুঁজিবাদী সমাজে মানুষের সাথে প্রকৃতির বৈরীমূলক দ্বন্দ্বের ভিত্তি নিহিত। জন বেলামী ফস্টার দেখিয়েছেন ইকোনমিক অ্যান্ড ফিলোজফিকাল ম্যানুস্ক্রিপ্টেই প্রকৃতির সাথে মানুষের বিচ্ছিন্নতার তত্ত্বের মধ্যেই এর ধারণা ছিল। পরিবেশের ধ্বংসসাধন কিছু দুষ্টু মানুষের দুষ্টুমি নয়, বরং পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার অবশ্যম্ভাবী ফলমাত্র। ফলে আজ একশ সত্তর বছর পর আমরা বুঝতে পারছি শ্রেণি সংগ্রামের প্রশ্নটিকে এড়িয়ে পরিবেশ বাঁচানোর চেষ্টা হনুমানের বগলে সূর্য চাপা দেওয়ার মতই হাস্যকর।

৪) শেষ কথা

ইউরোপ বা আমেরিকার দিকে তাকালে দেখব ‘বেসরকারি হলে পরিষেবা ভালো হবে’ করতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েছে। গত দশ বছরে স্বাস্থ্যখাতে ৩৭ বিলিয়ন ইউরো বরাদ্দ কমেছে, বন্ধ হয়েছে ৩৫৯টি সরকারি হাসপাতাল। অন্যদিকে কর্পোরেটদের চাপে কারখানাও বন্ধ করা যাচ্ছিল না। ফলে শেষ অবধি শ্রমিক ধর্মঘটের চাপে ২৫ শে মার্চ যখন দিনে মৃত্যু সংখ্যা ৬০০এর কাছাকাছি ততদিনে লকডাউন হল। অন্যদিকে পুঁজিবাদের স্বর্গ আমেরিকার গল্প আরো তিন কাঠি উপরে। সেখানে শ্রমিকরা কাজ হারানোর ভয়ে শারীরিক অসুস্থতা চেপে যান। ২০০৯-এর সোয়াইন ফ্লুর সময় আক্রান্ত হওয়া শ্রমিকদের তিন ভাগের এক ভাগই অসুস্থ অবস্থাতেও চাকরি যাওয়ার ভয়ে যতদিন পেরেছে কাজ করে গেছে — এবং সংক্রমণ ছড়িয়েছে। আসলে অতিমুনাফার জন্য দৌড় পুঁজিবাদের মৌলিক বৈশিষ্ট্, কিছু ভালোমানুষ বা ঈশপের গপ্পো দিয়ে এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়া অসম্ভব ব্যাপার।

কোরোনা একদিন শেষ হবে, মানুষ খারাপ সময় কাটিয়ে উঠবে। বা উঠবে না। যে অর্থনৈতিক সংকট আসতে চলেছে তার হাত থেকে ‘বাঁচার’ জন্য আরো কয়েকশ কোটি মানুষ মানবেতর জীবন কাটাতে বাধ্য হবেন, হয়ত আরো একটা দুটো যুদ্ধ হবে, নয়া উপনিবেশের মানুষের উপর আরো একটু চেপে বসবে পুঁজিবাদের পাথর।

তবে কোরোনা জানিয়ে গেল আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই দুটোর বেশি পথ খোলা থাকবে না, হয় সমাজতন্ত্র অথবা আমাদের এই প্রিয় গ্রহটির ধ্বংস।

এই প্রবন্ধটি কি আপনার ভাল লেগেছে?

তাহলে মাত্র ৫০০ ভারতীয় টাকার থেকে শুরু করে আপনার সাধ্য মতন এই ব্লগটি কে সহযোগিতা করুন

যেহেতু আমরা FCRA-তে পঞ্জীকৃত নই, অতএব ভারতের বাইরের থেকে সহযোগিতা আমাদের পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব নয়।


One Response

  1. Science, neither Marxism nor Capitalism, is a solution of an endemics. An infectious disease does not care human political views or other similar stupidities.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

CAPTCHA


পিপলস রিভিউ বাংলা – People's Review Bangla