বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ইস্তাহারে ঢপ দেওয়া কে শিল্পের পর্যায়ে উন্নত করা হয়েছে

রাজনীতি

ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী-র আশীর্বাদে ঢপ এর চপ বিক্রি করাটা একেবারে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে তা রবিবার, ২১শে মার্চ ২০২১ এ বোঝা গেল যখন কেন্দ্রীয় গৃহমন্ত্রী, গুজরাটের অমিত শাহ, মধ্যপ্রদেশের হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্ট ও বাঙালি-বিদ্বেষী নেতা কৈলাশ বিজয়বর্গীয়-র সাথে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ইস্তেহার থুড়ি “সংকল্প পত্র” প্রকাশ করলেন। বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ইস্তাহারে ঢপ দিয়ে মানুষ কে বোকা বানানোর ব্যাপারটা একটা উচ্চতম পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। “সোনার বাংলা” গড়ার সংকল্প যে দিলীপ ঘোষের গরুর দুধে পাওয়া সোনা দিয়ে হবে তাও বোধহয় ঢপ দিয়ে প্রমাণ করে ফেলতো বিজেপি।

কী নেই বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ইস্তাহারে? আপনার গরু হারালে এখানে আপনি তাও খুঁজে পাবেন। এ যেন কল্পতরু। নির্বাচনে জিতেই যেন বিজেপি টাকার বৃষ্টি করবে জনগণের উপর। বিগত দিনে তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনের আগে প্রয়াত জয়ালালিথা আর করুণানিধি এই ধরণের চমকের আর জনমোহিনী ঢপের প্রতিশ্রুতি দিলেও সেটা কখনোই বিজেপির মতন আধুনিক শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। হিন্দুত্ব ফ্যাসিবাদ, নয়া উদারনৈতিক অর্থনীতি আর চরম মিথ্যার জাল মিশিয়ে তৈরি হয়েছে বিজেপির “সংকল্প পত্র” তা একটু পড়লেই বোঝা যায়।

কী বড় চমক আছে বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ইস্তাহারে?

ভাঁড়ারে মা ভবানী হলেও ঝুড়ি ভর্তি প্রতিশ্রুতি বেচতে বিজেপির কোন সমস্যা হ্য়নি। একদম শুরুতে, বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ইস্তাহারে ঘোষিত প্রতিশ্রুতিগুলো নিয়ে বলতে উঠে শাহ বললেন যে খরচের জন্যে অর্থ বরাদ্দ কোথা থেকে করতে হবে তা নিয়ে যেন চিন্তা না করতে হয় কারণ তিনি নাকি “বণিক পরিবারের সন্তান” তাই প্রতিটি পাই পয়সার হিসাব করেই নাকি প্রকল্পগুলোর পরিকল্পনা তিনি করেছেন।

গুজরাটি বণিকের গল্প শুনে ভাল লাগলেও এই জনমোহিনী প্রকল্পগুলোর প্রতিশ্রুতি নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠছে যার জবাব বিজেপি দেবে না। দেখতে গেলে এই সংকল্প পত্রে সবকিছুই আছে, সত্য কে বাদ দিয়ে। কিন্তু যদি আমরা বড় ঘোষণাগুলোর উপর নজর দিই তাহলে দেখবো:

চাকরি ও ‘রোজগার’ নিয়ে এক ঝুড়ি প্রতিশ্রুতি

সোনার বাংলা গড়তে যেহেতু প্রচুর ‘কর্মসংস্থান’ বা বিজেপি-র ভাষায় ‘রোজগারের সুযোগ’ তৈরি করতে হবে তাই এই নিয়ে অফুরন্ত ঘোষণা বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ইস্তাহারে রয়েছে। নজরকাড়া সকল প্রতিশ্রুতি সমৃদ্ধ এই ইস্তাহারে বলা হয়েছে যে প্রতি পরিবারের একজন কে “রোজগার” এর সুযোগ করে দেওয়া হবে আগামী পাঁচ বছরে। এইবার মোদী দীর্ঘদিন আগে তাঁর পদলেহী এক দালাল চ্যানেলের সাথে কথোপকথনে বলেছিলেন যে তিনি মনে করেন কেউ যদি পকোড়া ভেজেও দুই শো টাকা দিনে রোজগার করছে তাহলে সেটাও কর্মসংস্থান বা রোজগার। তার মানে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় আড়াই কোটি পরিবার পিছু একটি করে তেলেভাজার দোকানের গ্যারান্টি দিচ্ছে বিজেপি।

যেহেতু পরিবার পিছু একটি রোজগার সৃষ্টির কথা হচ্ছে তার মানে প্রতিটি পরিবারে যদি একজনও ‘রোজগার’ করে, তা ন্যূনতম বেতনের চেয়েও কম হোক না কেন, বিজেপি গলা ফাটিয়ে সেটা নিজের সাফল্য বলে প্রচার করবে। অথচ এটা ঘটনা যে বেশির ভাগ পরিবারেরই, তা একেবারে দারিদ্র্য-ক্লিষ্ট হলেও, একটি রোজগারের পথ রয়েছে যার মাধ্যমে সেই পরিবারের সদস্যরা এতদিন বেঁচে এসেছেন। এর মধ্যে বিজেপি কি নতুন আরও একজনের কর্মসংস্থান বা ‘রোজগার’ সৃষ্টির কথা বলছে? তা না হলে কি পুরানো রোজগার কে শেয়ালের কুমিরছানা দেখানোর মতন নিজের সাফল্য হিসাবে দেখাবে বিজেপি?

ডিসেম্বর মাসে ৭৫ লক্ষ বেকার কে জব কার্ড দেওয়া হবে বলে ঘোষণা করে বিজেপি। কিন্তু তারপরে তাড়াতাড়ি সেই ঘোষণা খারিজ করে দলের নেতারা এই বলে যে বিজেপি কাউকে চাকরির প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে না বরং বলছে যে ক্ষমতায় আসলে সবার ‘রোজগার’ এর সুযোগ সৃষ্টি করবে। তবে যেহেতু ভোট বড় বালাই তাই বলা হয়েছে যে রাজ্য সরকারের সমস্ত শূন্য পদ পূর্ণ করা হবে। কমন এলিজিবিলিটি টেস্ট (কেট) চালু করে দুর্নীতিহীন নিয়োগের রাস্তা খোলা হবে বেকারদের জন্যে।

এহেন ঘটা করে সরকারি চাকরি দেব ঘোষণা করলেও সবার জানা আছে যে বছরে দুই কোটি করে পাঁচ বছরে দশ কোটি বেকার কে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মোদী সরকার ২০১৪ সালে গঠিত হয়েছিল। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের মধ্যে এই চাকরি তো দূর, দেশের বেকারত্বের হার ৪৫ বছরের সর্বাধিক ৬.১% পৌঁছায়। তবে সেটাও সোনালী সেই পুরানো দিনের গল্প। কারণ অর্থ বছর ২০১৯-২০তে বেকারত্বের হার ৭.৬৩% হয়ে যায় আর এপ্রিল ২০২০ তে তা ২৩.৫২% এ পৌঁছায় আর ফেব্রুয়ারি ২০২১ এ ৬.৯০% থাকে।

মোদী সরকার গত সাত বছরে যখন কেন্দ্রীয় সরকারের একটিও খালি পদ পূর্ণ করেনি, কাউকেই চাকরি দেয়নি, বরং রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিক্রি করে আর নানা অছিলায় হাজার হাজার মানুষ কে ছাঁটাই করেছে, বিএসএনএল আর এমটিএনএল এর মতন সংস্থা কে রিলায়েন্স জিও এর স্বার্থে ধ্বংস করেছে, তখন সেই মোদীর বিজেপি যে পশ্চিমবঙ্গের বেকার যুবদের কী ভীষণ ভালবেসে চাকরি দেবে সেই কথাও বলাই বাহুল্য। এর সবচেয়ে ভাল উদাহরণ হলো বিপ্লব দেব-র নেতৃত্বাধীন ত্রিপুরার বিজেপি সরকার। শুধু মাত্র সরকারি চাকরিতে নিয়োগ বন্ধ করেনি দেব সরকার, বরং রাজ্য সরকারের চাকরি তুলে দিয়ে সব পদে আউটসোর্সিং করে কর্মী নিয়োগের নীতি গ্রহণ করে বিজেপির অন্দরেই তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি করে শেষে কর্মচারী আন্দোলনের মুখে সাময়িক ভাবে পিছু হঠেছে এই সরকার

এহেন বিজেপি কী ভাবে পশ্চিমবঙ্গের সব শূন্যপদ পূরণ করবে ও বেকারদের চাকরির ব্যবস্থা করবে? দেশের যে রাজ্যগুলোয় বিজেপি শাসন করছে সেই রাজ্যগুলোয় কি সমস্ত বেকাররা চাকরি পেয়েছেন? সরকারি সব পদ পূর্ণ হয়েছে? দুর্নীতি-মুক্ত ঢালাও সরকারি কর্মসংস্থানের কোন নজির কি গেরুয়া দলটি গোটা দেশে কোথাও গড়েছে যে বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ইস্তাহারে এই নিয়ে ঢালাও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হল?

ৃষক ও কৃষি নিয়ে মিথ্যা প্রতিশ্রুতির বন্যা

৭৫ লক্ষ কৃষককে বছরে ১০,০০০ টাকা করে অনুদান আর প্রধানমন্ত্রী কিষান সম্মান নিধি প্রকল্পের বকেয়া ১৮,০০০ টাকা মিটিয়ে দেওয়ার কথা বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ইস্তাহারে বলা হয়েছে। তবে এই টাকার যোগান কোথা থেকে হবে সেটা বণিক শাহ জানাননি। ঠিক যেমন জানাননি যে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে যদি প্রধানমন্ত্রী কিষান সম্মান নিধি প্রকল্পের অর্থ গোটা দেশের তুলনায় (বাৎসরিক ৬,০০০ টাকা) বেড়ে যায় তাহলে বিজেপি-শাসিত অন্য রাজ্যগুলোও এই বর্ধিত অঙ্ক দাবি করবে। সেটা মোদী আর শাহ কী দিয়ে ঠেকাবেন? নাকি গোটা দেশের জন্যেই কৃষকদের বাৎসরিক অনুদান ১০,০০০ টাকা হবে?

তিনটি সর্বনাশা কৃষি আইন, যার মধ্যে দিয়ে মোদী সরকার কৃষকদের কে কর্পোরেটগুলোর গোলামে পরিণত করছে, বিরোধিতা করে পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও পশ্চিম উত্তর প্রদেশের কৃষকেরা আজ চার মাস ব্যাপী আন্দোলন করছেন দিল্লীর সীমান্তে। সেই কৃষক আন্দোলনের অন্যতম দাবি হল গোটা দেশের জন্যে আইন করে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (এমএসপি) এর গ্যারান্টি। সেই গ্যারান্টি কৃষকদের দিতে নারাজ দিল্লীর মোদী সরকার। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে মোদীর দল কৃষক দরদী সাজছে।কৃষকদের উৎপাদনের সঠিক মূল্য দিতে ৫,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করার ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এই ৫,০০০ কোটি টাকার জায়গায় কেন তাঁদের জন্যে এমএসপি তে ফসল খরিদ করানো বাধ্যতামূলক করার কথা বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ইস্তাহারে বলা হল না?

বলা হয়েছে যে ভূমিহীন কৃষকদের আর ভাগচাষীদের বাৎসরিক ৪,০০০ টাকা করে দেওয়া হবে। দীর্ঘদিন ধরে বিজেপি-শাসিত গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ, বিহার, প্রভৃতি রাজ্যে কিন্তু ভূমিহীন কৃষকদের জন্যে এইরকম কোন প্রকল্প নেই। “এক দেশ” তাই এক নিয়ম হওয়া উচিত বলা বিজেপি কেন বিহার ও মধ্যপ্রদেশের ভূমিহীন কৃষকদের বঞ্চিত করবে? নিজের রাজ্যের কৃষককে না দিয়ে কেন বিজয়বর্গী বাংলার ভূমিহীন কৃষকদের এহেন প্রকল্প দেবে? তার মানে কি এই রকম অর্থ দেওয়ার প্রস্তাবও বিশ বাওঁ জলে থাকবে বিজেপি ক্ষমতায় এলে?

মহিলাদের জন্যে ভাওঁতার ফিরিস্তি

বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ইস্তাহারে বলা হয়েছে যে শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গে মেয়েদের কেজি থেকে পিজি (স্নাতকোত্তর) স্তর অবধি পড়াশুনা বিনা মূল্যে হবে। ঘোষণাটি চমকপ্রদ তবে এটি শুধুই সরকারি শিক্ষালয়গুলোয় হবে না সমস্ত ক্ষেত্রেই, যেমন বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং বা মেডিক্যাল সাইন্সের ক্ষেত্রেও হবে সেটা ঘোষিত হয়নি।

মনে রাখা দরকার মোদী সরকার দেশের জনশিক্ষা ব্যবস্থা কে, অর্থাৎ জনতার করের টাকায় চলা শিক্ষা কে ধ্বংস করছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনুদান কম করছে, তাদের বেসরকারিকরণ করছে। বড় কর্পোরেটদের সাহায্য করছে শিক্ষা ক্ষেত্রটিতে একাধিপত্য কায়েম করতে। নব্য শিক্ষা নীতি ২০২০ এর মাধ্যমে গোটা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা কে বিজেপি শুধু মধ্যবিত্ত ও বড়লোকদের একচেটিয়া করে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এহেন সময়ে যখন জনশিক্ষা ব্যবস্থাই থাকবে না, তখন বিনামূল্যে শিক্ষা কোথায় পাবে মেয়েরা?

এর সাথেই বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ইস্তাহারে ঘোষণা করা হয়েছে যে মহিলাদের জন্যে সরকারি চাকরিতে ৩৩% সংরক্ষণ করা হবে। বিজেপি যদিও এহেন কোন সংরক্ষণ তার দ্বারা শাসিত রাজ্যগুলোয় আজ অবধি করেনি, তবুও পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে যদি করেও ফেলে তাহলেও যখন সরকারি চাকরিই থাকছে না আগামী দিনে বিপ্লব দেব এর মডেলে চলে, সেখানে সংরক্ষণ ১০০% রাখলেও কি মহিলাদের কোন লাভ হতো?

বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ইস্তাহারে বলা হয়েছে মহিলাদের সমস্ত গণপরিবহন মাধ্যমে বিনামূল্যে যাতায়ত করতে দেওয়া হবে। এই প্রকল্পটি অরবিন্দ কেজরিওয়ালের দিল্লী শহরে মহিলাদের বাসে বিনামূল্যে ভ্রমণের সুযোগের প্রকল্পের থেকে নকল করা। যখন কেজরিওয়াল এই বিনামূল্যে মহিলাদের বাসে ভ্রমণ ঘোষণা করেছিলেন তখন বিজেপি তার বিরোধিতা করেছিল। বিজেপি বলেছিল কেজরিওয়াল নাকি মহিলাদের ভিখারিনী বানিয়ে দিচ্ছে। বিজেপি দিল্লী মেট্রো রেলে কেজরিওয়াল এর বিনামূল্যে ভ্রমণের প্রস্তাব নাকচ করেছিল। হঠাৎ পশ্চিমবঙ্গের মহিলাদের জন্যে সেই বিজেপির এত দরদ কেন?

পশ্চিমবঙ্গের গণপরিবহন মাধ্যমে বাস পরিষেবার সিংহ ভাগ দিল্লীর মতন সরকারি হাতে নেই বরং বেসরকারি হাতে আছে। যদি সরকারি বসে মহিলাদের যাতায়ত বিনামূল্যে করানো হয় তাহলে লাভ পাবেন অল্প কিছু মহিলা আর যদি বেসরকারি ক্ষেত্রে করানো হয় তাহলে তা কী ভাবে প্রয়োগ করা হবে আর বেসরকারি বাস মালিকেরা কী ভাবে তা প্রয়োগ করবে কোন কিছুই বিশদে বলা নেই।

আবার গণপরিবহন মাধ্যমের একটি বড় অংশ জুড়ে পশ্চিমবঙ্গে আছে ট্রেন। এবার কি ভারতীয় রেলে মহিলাদের জন্যে বিনামূল্যে পরিবহনের প্রস্তাব আনবে বিজেপি? কারণ রেলের পরিবহন সংক্রান্ত নীতি তো সারা ভারতে প্রয়োগ হয়, সেই ক্ষেত্রে যে রেল লকডাউন এর সময়ে শ্রমিকদের নিজ রাজ্যে নিয়ে যাওয়ার ভাড়া রাজ্য সরকার থেকে আদায় করে, সেই রেল কী করে বিনামূল্যে সারা দেশে মহিলাদের পরিবহন পরিষেবা দেবে? এই ঢপের ফাঁসে বিজেপি নিজেই নিজেকে ফাঁসিয়েছে আর এর থেকে অন্য রাজ্যেও সে পরিত্রাণ পাবে না।

অন্নপূর্ণা ক্যান্টিন ও সস্তায় খাদ্য পণ্য সরবাহ

বলা হয়েছে গোটা রাজ্যে অন্নপূর্ণা ক্যান্টিন করে দিনে তিনবার ৫ টাকার বিনিময়ে খাবার দেওয়া হবে। তাতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের “মা” ক্যান্টিন কী ক্ষতি করলো বোঝা গেল না। যদিও তৃণমূল কংগ্রেসের “মা” ক্যান্টিনে ৫ টাকায় ডিম ভাত পাওয়া যায়, শুদ্ধ নিরামিষাশী বিজেপির “অন্নপূর্ণা” ক্যান্টিনে হয়তো তাতেও কোপ পড়বে কারণ নেতৃত্বে যেহেতু বিজয়বর্গীয়, যাঁর নিজের রাজ্যে মিডডে মিল থেকে ডিম বাদ দিতে হয়েছে হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদের নিয়ম অনুসারে।

তবে মজার ঘোষণা হল যে এক টাকা কিলো দরে গম, ৩০ টাকা কিলো দরে ডাল, ৩ টাকা কিলো দরে নুন আর ৫ টাকা কিলো দরে চিনি বিক্রি করা হবে। যে মুহূর্তে সরকার অত্যবশকীয় পণ্য আইন, ১৯৫৫, তে ব্যাপক সংশোধন করে খাদ্যশস্যে কালোবাজারি করার রাস্তা প্রশস্ত করছে দিল্লীতে ঠিক তখন পশ্চিমবঙ্গ কে এই রকম সস্তায় গণ বন্টন ব্যবস্থার মাধ্যমে খাদ্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি যে বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ইস্তাহারের মহা ঢপ তা সহজেই বোধগম্য।

পশ্চিমবঙ্গের বেশির ভাগ মানুষ যেহেতু চাল দিয়ে ভাত বানিয়ে খান তাই গমটা চালের বিকল্প হিসাবে রাখায় খুব সহজেই চালের অমিল বজায় রেখে মানুষ কে গম দেওয়া হবে যা তাঁরা নিতে চাইবেন না ফলে এই প্রকল্পের কোন সুফল সাধারণ মানুষ পাবেন না। তবে এত কিছুই যদি সস্তায় দেওয়ার থাকে মোদী সরকারের তাহলে এর সাথে রান্নার গ্যাস, যার দাম কিছুদিনের মধ্যেই ১০০০ টাকা সিলিন্ডার ছুঁয়ে ফেলবে, তা কমানোর কোন প্রতিশ্রুতি কেন দিচ্ছে না বিজেপি? মানুষ কে কি রান্না করতে আবার জঙ্গলে গিয়ে কাঠ কাটতে হবে? যদিও গৌতম আদানি কে ৫৫,০০০ হেক্টর জঙ্গল ছত্তিশগড়ের হাসদেও আরান্দ অঞ্চলে খননের জন্যে মোদী সরকার তুলে দিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কে বোধহয় জঙ্গল থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে দেওয়া হবে না।

২০০ ইউনিট অবধি বিনামূল্যে বিদ্যুৎ

যেহেতু পশ্চিমবঙ্গে বিদ্যুতের ইউনিট প্রতি দাম দেশের মধ্যে সর্বাধিক তাই ২০০ ইউনিট অবধি বিনামূল্যে বিদ্যুৎ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি—আবার কেজরিওয়ালের থেকে চুরি করা—দিয়ে কেল্লা ফতেহ করতে চাইছে বিজেপি। কিন্তু সমস্যা হল এই প্রকল্পটির বিরোধিতা দিল্লীতে বিজেপি করেছে এবং এটি কে একটি লোক দেখানো খেলা বলে দিল্লী সরকারের সমালোচনাও করেছে। সেই কেজরিওয়ালের থেকে চুরি করা প্রকল্প যদি পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি নিয়ে আসে তাহলে কি দিল্লী সরকারের এই প্রকল্পটি কে খোলাখুলি সমর্থন করবে বিজেপি? কেন বিদ্যুৎ মাশুল কমানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হল না?

উত্তরবঙ্গ, জঙ্গলমহল ও সুন্দরবনে এইমস এর ধাঁচে হাসপাতাল

দীর্ঘ সাত বছরে পুরাতন সরকারের দ্বারা শুরু করা নয়া অখিল ভারতীয় আয়ুর্বিজ্ঞান সংস্থান (এইমস) এর কাজ কতদূর এগোলো তার কোন বৃত্তান্ত কিন্তু দেওয়া হয়নি। যে এইমস ধাঁচের হাসপাতাল দেশের কোনায় কোনায় গড়ে তোলা হবে জনতার ট্যাক্সের টাকায়, সেগুলো আবার কবে বেচা হয়ে যাবে আদানি বা মুকেশ আম্বানি কে সেই কথা কেউ জানতেও পারবেন না। তাই রায়গঞ্জের এইমস এর বিষয়ে কোন কথা হল না। কথা হল না কল্যাণীর এইমস নিয়ে। যদি এই এইমসগুলো ব্যাঙের ছাতার মতন গজিয়ে না উঠে জনগণের মৌলিক প্রয়োজন যে স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো, যে ব্লক, মহকুমা ও জেলা হাসপাতালগুলো, সেগুলোর পরিকাঠামো উন্নয়ন করে ও খালি পদ পূর্ণ করার কথা থাকতো, ও জনগণ কে তাঁদের বাড়ির পাশেই সুস্বাস্থ্য পাওয়ার বন্দোবস্তের কথা বলা হত, তাহলেও হয়তো এইরকম ঢপ মানুষ পছন্দ করতো।

রাজ্যে নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন, ২০১৯, লাগু করা ও শরণার্থী পরিবারদের পাঁচ বছরের জন্যে ১০,০০০ টাকা

নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন, ২০১৯ (সিএএ ২০১৯), মাত্র ৩১,৩১৩ জন কে নাগরিকত্বের জন্যে আবেদন করার সুযোগ দেবে জয়েন্ট পার্লামেন্টারি কমিটির কাছে কেন্দ্রীয় গৃহ মন্ত্রকের হলফনামা অনুসারে। এই ৩১,৩১৩ জন কারা? তাঁরা যাঁদের পাসপোর্ট (ভারতে প্রবেশ) রুলস এর ২০১৫ সংশোধনীতে আর ফরেনার্স রুলস ২০১৫ এর সংশোধনীতে ছাড় দেওয়া হয়েছে। একমাত্র এই ছাড় পাওয়া লোকেরাই নাগরিকত্বের জন্যে আবেদন করতে পারবেন বাকিরা পারবেন না আর তাই বহুদিন ধরে বিতর্কিত আইনটি মতুয়া ও অন্য উদ্বাস্তুদের চোখের সামনে ঝুলিয়ে রাখলেও আইনের রুলস বা প্রয়োগের নিয়মাবলী বের করেনি মোদী সরকার।

শাহ বলেছিলেন যে সিএএ ২০১৯-এর রুলস বের হবে করোনা ভাইরাসের টিকাকরণ শেষে। সেই টিকাকরণ শেষ হয়নি। তাহলে প্রথম মন্ত্রীমন্ডলের বৈঠক যদি মে মাসে হয় তাহলে তখন কি রুলস প্রকাশিত হয়ে যাবে? আর তখন যদি রুলস প্রকাশ করতে বাঁধা না থাকে তাহলে সেই রুলস আগে কেন বের হল না? আর যদি দেখা গেল—যা অবশ্যই দেখা যাবে—যে মতুয়াদের আর অন্য উদ্বাস্তুদের আবেদন করার ও ধর্মীয় নির্যাতন প্রমাণ করার পথ নেই তাহলে কী হবে? তাহলে তো সমস্ত উদ্বাস্তুদের, যাঁদের ভোটে বিজেপি জিতবে, স্থান হবে ডিটেনশন সেন্টারে। অথবা জাতীয় নাগরিকপঞ্জী (এনআরসি) হওয়ার ফলে তাঁরা অধিকারহীন বেনাগরিকে, সস্তা শ্রমিকে পরিণত হয়ে যাবেন। তাহলে ১০,০০০ টাকা কাদের একাউন্টে যাবে? বিজেপির গুন্ডাদের?

উপরের পয়েন্টগুলো ছাড়াও আছে অনেক অনেক ঢপের গল্প। বিধবা ভাতা ১,০০০ থেকে বাড়িয়ে ৩,০০০ টাকা করার কথা। আছে মেয়েদের ১৮ বছর পূর্ণ হলে ২ লক্ষ টাকা দেওয়ার কথা। আছে কেন্দ্রীয় সরকারের আয়ুষ্মান ভারত স্কিম দিয়ে রাজ্যের স্বাস্থ্য সাথী কে শেষ করার কথা। আছে নোবেল প্রাইজের সমতুল্য (?) একটি পুরস্কার ঘোষণার কথা ও আরও অনেক প্রতিশ্রুতি। এই প্রতিশ্রুতির বন্যায় ভাসতে ভাসতে মানুষ যদি একবার প্রশ্ন করেন যে দেশের সরকার যখন সম্পদ বেচে সংসার চালাচ্ছে তখন এই জনমোহিনী প্রতিশ্রুতিগুলো প্রয়োগ করার টাকা কোন গৌরী সেন দেবেন, তাহলেই কিন্তু দুধের আর জলের মধ্যে পার্থক্য বোঝা যেত।

বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ইস্তাহারে বলা নেই যে কথাগুলো তা হল মোদী বলেছিলেন যে সমস্ত কালো টাকা সুইস ব্যাঙ্কগুলোর থেকে দেশে ফিরবে। বলেছিলেন পেট্রল আর ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি কড়া হাতে রুখবেন। বলেছিলেন যে যদি নোট বন্দী করার ফল ৫০ দিনে না পাওয়া যায় তাহলে যেন তাঁকে জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলা হয়। বলেছিলেন ২১ দিনের লকডাউন করে, ঘটি-বাটি বাজিয়ে করোনা মুক্ত হবে দেশ। বলেছিলেন এই রকম বহু কথা। কারণ কথা বলতে টাকা লাগে না। তবে মানুষের একবার জিজ্ঞাসা করা উচিত যে এই প্রতিশ্রুতিগুলোর আগের প্রতিশ্রুতিগুলোর কী হল? কী হল মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাবার প্রতিশ্রুতি? কী হল বেকারত্ব শেষ করার প্রতিশ্রুতি? কী হল কৃষকদের ফসলের উপর এমএসপি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি? জবাব তাঁরা হাতেনাতে পেয়ে যাবেন।

এই প্রবন্ধটি কি আপনার ভাল লেগেছে?

তাহলে মাত্র ১০০ টাকার থেকে শুরু করে আপনার সাধ্যমত আর্থিক সহায়তা করে আমাদের এই নির্ভীক ব্লগটি কে সহযোগিতা করুন

যেহেতু আমরা FCRA-তে পঞ্জীকৃত নই, অতএব ভারতের বাইরের থেকে সহযোগিতা আমাদের পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব নয়।

আপনার মতামত জানান