যদিও বাঙালির চেতনায় ইংরাজি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের ২১ তারিখটি তার জাতিসত্ত্বার জন্যে চির স্মরণীয় হয়ে রয়েছে পূর্বতন পূর্ব পাকিস্তানে ——বর্তমান বাংলাদেশে —— বাংলা ভাষার জন্যে আন্দোলন করে পাকিস্তানী শাসকদের গুলিতে হত ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগের কারণে, সেই ফেব্রুয়ারি মাসের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ আর রক্তে ভেজা দিন বাংলার স্মৃতিতে আজ আর নেই, কারণ ইতিহাস এই দিনটার কথা কে অনেক গভীরে কবর দিয়েছে। দিনটি ১৮ই ফেব্রুয়ারি। আজ থেকে ৪০ বছর আগে এই ১৮ই ফেব্রুয়ারিতে সংগঠিত হয় দেশভাগ-পরবর্তী ভারতের সব চেয়ে বড় আর কুখ্যাত বাঙালি গণহত্যা – অসমের নেলি গণহত্যা।  

সরকারি হিসাবে অসমের নেলি গণহত্যায় নগাওঁ জেলার জাগ্গি রোড থানার অন্তর্গত নেলির ১৪টি গ্রামের —আলীসিংহ, খুলাপাথর, বসুন্ধরী, বুগডুবা বিল, বাগডুবা হাবি, বড়জোলা, বুটুনি, ডোঙ্গাবাড়ি, ইঁদুর মারি, মাটি পর্বত, মূলাধারী, মাটি পর্বত আট নম্বর, সিলভেটা, বড়বুড়ি আর নেলি—অসংখ্য বাংলাভাষী বসবাসকারীকে হত্যা করা হয় ১৮ই ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩তে। যদিও সরকারি হিসাবে সংখ্যাটা ২,১৯১, কিন্তু বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যাটা প্রায় ১০,০০০, যা ১৯৮৪ সালের শিখ গণহত্যা আর ২০০২ সালের গুজরাটের মুসলিম গণহত্যার চেয়ে বহু বেশি। অথচ, আজ পর্যন্ত এই গণহত্যার ঘটনায় জড়িতরা কেউ শাস্তি তো পায়নি, বরং অসমের বাঙালি-বিদ্বেষী মূলস্রোতের রাজনীতিতে তাদের চরম উন্নতি হয়েছে। 

অসমের নেলি গণহত্যা নিয়ে এককালে বিস্তর লেখালেখি হয়েছিল। কয়েক বছর আগে এই নেলি গণহত্যার পরে ভারত সরকারের সাথে অসম আন্দোলনের নেতৃত্বের চুক্তির ভিত্তিতে, নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন, ২০০৩ (সিএএ ২০০৩) অনুসারে, ভারতের সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাধানে যখন ভারতীয় জাতীয় নাগরিকত্ব পঞ্জি (এনআরসি) অভিযান অসমে চালানো হয় ও তার ফলে ১৯ লক্ষ মানুষ নাগরিকত্ব হারান, তখন নেলির প্রসঙ্গ উঠে আসে।  

এককালে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের হেমেন্দ্র নারায়ণ ও অসম ট্রিবিউন পত্রিকার বেদব্রত লহকার এই গণহত্যা নিয়ে বিস্তর লেখালেখি করেছিলেন, নানা তথ্যচিত্রও তৈরি হয়েছিল এই বিষয়ে। কিন্তু যা অধরা থাকল তা হল এই গণহত্যার ঘটনায় নিপীড়িত মানুষ ৪০ বছরেও ন্যায়ের মুখ দেখলেন না, বরং যে শক্তির প্ররোচনায় এককালে বাঙালি-বিরোধী অসম আন্দোলন শুরু হয়েছিল, সেই শক্তি আজ সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও বাঙালি জাতির মধ্যে ধর্মীয় মেরুকরণ করে অসম ও ভারতের কেন্দ্রে আজ ক্ষমতায় আসীন।  

নেলি গণহত্যা নিয়ে একটি ১৯৮৮ সালের প্রতিবেদন  

কলকাতার দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকার অসম প্রতিবেদক হয়ে তৎকালীন সময়ে সাংবাদিক অরূপ চন্দ ১৯৮৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নেলিতে যান ও সেখানে এই গণহত্যার ঘটনায় যে সব প্রত্যক্ষদর্শী তখনও বেঁচে ছিলেন তাঁদের সাথে কথা বলেন। তাঁর গ্রাউন্ড রিপোর্টটি ১২ই মার্চ ১৯৮৮-র স্যাটারডে স্টেটসম্যানে প্রকাশিত হয়।  

সেই প্রতিবেদনে প্রত্যক্ষদর্শীরা যে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বয়ান করেছেন তৎকালীন ভারতে তা অভূতপূর্ব ও নৃশংস শোনালেও ১৯৮৪ সালের শিখ গণহত্যা, ১৯৯২ সালের বাবরি মসজিদ ধ্বংস ও তার পরে সারা দেশে মুসলিম নিধন যজ্ঞ, ২০০২ সালের গুজরাট মুসলিম গণহত্যা, ২০০৮ সালের উড়িষ্যার খ্রিস্টান গণহত্যা, ২০১৩ সালের মুজ্জাফরনগর গণহত্যা বা ২০২০ সালের দিল্লীর মুসলিম গণহত্যার পরে অনেক গা-সওয়া ব্যাপার হয়ে গেছে।

অসমের সাথে খুবই ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে পরার পরে চন্দ নেলি নিয়ে যে তদন্ত করেন সেই নিয়ে তিনি নানা কথোপকথনে পিপলস রিভিউ কে তাঁর অভিজ্ঞতা জানান। এই প্রবন্ধে আমরা চন্দের ১৯৮৮ সালের রিপোর্টটির ভিত্তিতেই সেই গণহত্যার ঘটনাটি কে ফিরে দেখার চেষ্টা করবো।

নেলি গণহত্যার পাঁচ বছর পরের দ্যা স্টেটসম্যান এর রিপোর্ট
নেলি গণহত্যা কাণ্ডের পাঁচ বছর পরে অরূপ চন্দের সরেজমিনে তদন্তমূলক রিপোর্ট প্রকাশিত হয় ১২ই মার্চ ১৯৮৮ এর দ্যা স্যাটারডে স্টেটসম্যান এ

অসমের নেলি গণহত্যা: কারণ ও ঘটনাবলী 

স্বাধীনতার অনেক আগে থেকেই অসমে বাঙালি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণা জাগিয়ে তোলা হয়। যদিও নিম্ন অসম মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা ঐক্যবদ্ধ বঙ্গের সিলেট জেলা কে কেটে বানিয়েছিল বাঙালি মুসলিম কৃষকদের দিয়ে সেই উর্বর অঞ্চল জুড়ে চাষাবাদ করিয়ে  কর বাবদ ঔপনিবেশিক শাসনের আয় বাড়ানোর উদ্দেশ্যে, অসমের জাতীয়তাবাদের চোখে বাঙালি সম্প্রদায়ের অসমে থাকাটাই চক্ষুশূল হয়। বিশেষ করে বাঙালি হিন্দুদের বারবার করে জাতি হিংসার ও সরকারি সন্ত্রাসের শিকার হতে হয়।  

নেলির গণহত্যা অসমে গত শতাব্দীর ছয়ের দশক থেকে শুরু হওয়া “বঙ্গাল খেদাও” আন্দোলন ও সাতের দশকের অসম আন্দোলনের ধারাবাহিকতার ফল ছিল। এবং এই গণহত্যার মধ্যে দিয়েই অসম আন্দোলনের পুরোধা অখিল অসম ছাত্র ইউনিয়ন (আসু) ভারত সরকারের সাথে অসমের মানুষের প্রতিনিধি হিসাবে ১৯৮৫ সালে অসম চুক্তি সই করতে পারে।  

১৯৮০ সালে ক্ষমতায় ফিরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁর কংগ্রেস (আই) দল কে অসম আন্দোলনের বিরুদ্ধে দাঁড় করান, যদিও মাটিতে, তৃণমূল স্তরে, তাঁর দলের লোকেরা কোনো উল্লেখযোগ্য সাফল্য পায়নি। এবং অসম আন্দোলন ক্রমাগত হিংস্র আর শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

যেহেতু এই আন্দোলনের ফলে জনগণের মধ্যেই জাতি-ভিত্তিক বিভাজন তীব্র হয়, তাই শ্রীমতি গান্ধী এই আন্দোলন কে দমন করার জন্যে বিশেষ কোনো পদক্ষেপ নেননি, যদিও এর আগে পশ্চিমবঙ্গের নকশাল আন্দোলন থেকে শুরু করে শিখ সম্প্রদায়ের খালিস্তান আন্দোলন কে দমন করতে তিনি সর্বশক্তি প্রয়োগ করতে পিছপা হননি।

১৯৮৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সময় আসু নির্বাচন বয়কটের ডাক দেয়। তারা দাবি তোলে যে বাংলাদেশ থেকে আগত তথাকথিত “বেআইনি অধিবাসীদের” নাম ভোটার তালিকার থেকে বাদ দেওয়ার। যেহেতু আসুর চোখে সমস্ত বাঙালিই প্রায় বেআইনি অভিবাসী তাই তাদের চোখে বাঙালি মুসলিম অধ্যুষিত নেলির বাসিন্দারাও শত্রু হিসাবে চিহ্নিত ছিলেন। বারবার করে অসম আন্দোলনের নেতৃত্ব নেলির জনগণ কে নির্বাচন বয়কট করার হুমকি দেয়, তবে সেখানকার সাধারণ মানুষ সেই দাবি মানতে অস্বীকার করেন।

তৎকালীন সময়ে নব্য গঠিত ও বর্তমানে ভারতের ও অসমের শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতা অটল বিহারি বাজপেয়ী সেই সময় অসমে যান ও অভিযোগ যে তিনি বলেন যে যেহেতু জায়গাটা অসম তাই সেখানকার মানুষ অভিবাসীদের সহ্য করছেন ও যদি এই ঘটনা পাঞ্জাবে ঘটতো, তাহলে সেখানকার মানুষ নাকি “অভিবাসীদের কেটে টুকরো টুকরো করে দিতেন”।

এই উত্তেজক ভাষণের ফলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়, যদিও শ্রীমতি গান্ধীর দ্বারা পাঠানো ৪০০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনী (সিআরপিএফ) ও ১১ কোম্পানি ভারতীয় সেনার উপস্থিতিতে জানুয়ারি আর ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩তে অসম বিধানসভা নির্বাচন পার হয়। নেলির বাসিন্দাদের ভোট পান তৎকালীন কংগ্রেস (আই) প্রার্থী প্রসাদ দলৈ। এর ফলে অসম আন্দোলনের নেতৃত্বের চোখের বিষ হয়ে ওঠেন এই অঞ্চলের বাঙালি গ্রামবাসীরা।

নেলি গণহত্যায় স্ত্রী আর চার বছরের সন্তান হারানো আলিমুদ্দিন চন্দ কে বলেন, “এই ঘটনা (কংগ্রেস কে ভোট দেওয়ার) নেতাদের ক্ষিপ্ত করে এবং তারা নির্বাচনের জন্যে মোতায়েন করা সিআরপিএফ জওয়ানদের প্রত্যাহারের পরে রক্তগঙ্গা বইয়ে দেওয়ার হুমকি দেন।”

এর পরে আসে সেই দিন। প্রত্যক্ষদর্শীরা চন্দ কে জানিয়েছিলেন যে ১৮ই ফেব্রুয়ারি ভোর বেলার থেকে ১৪টি গ্রামে একযোগে আক্রমণ শুরু করে খুনে বাহিনী। তাদের মধ্যে সর্বাধিক ছিল ছোট নাগপুর থেকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের দ্বারা অসমে আনা আদিবাসীরা। ভোর বেলায় আগ্নেয়াস্ত্র, বল্লম, তীর ধনুক ও মশাল নিয়ে এই দাঙ্গাকারীরা আক্রমণ চালায় গ্রামে গ্রামে।  

নির্বিচারে গুলি চালানো শুরু হয় মানুষের উপর আর প্রতিটি কুঁড়েঘরের চালে মশাল দিয়ে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। যাঁরা দৌড়ে পালাতে যান তাঁদের গুলি খেয়ে মরতে হয়। ঘটনায় হতচকিত হয়ে যান সাধারণ গ্রামবাসীরা, যাঁরা নিজেদের বাড়ির দা-কাটারিও বের করতে পারেননি প্রতিরোধ করার জন্যে।

“কী করে বন্দুকবাজ খুনিদের আমরা রুখে দিতাম? আমরা আমাদের কাস্তে বা ছুরি বের করার আগেই তারা আমাদের গুলি করে দিচ্ছিল,” মোহাম্মদ হজরত আলী বলে মাটি পর্বত গ্রামের এক বৃদ্ধ চন্দ কে জানান। এই আক্রমণের আগাম খবর কিছু মানুষ স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য বাবুলালের থেকে জেনে গেছিলেন বলে আগের থেকে প্রস্তুত ছিলেন ও পালিয়ে ১১ কিমি দূরে জাতীয় সড়কে পৌঁছে প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হন। কিন্তু বাকিরা এত ভাগ্যবান ছিলেন না। বৃদ্ধ, মহিলা থেকে শুরু করে যুবকদের, এমন কি মাদ্রাসার পড়ুয়া বাচ্চাদেরও রেহাই করেনি গণহত্যাকারী বাহিনী।

চন্দের রিপোর্টে বলা হয়েছে যে কোনো ক্রমে ১৪টি গ্রামের বাসিন্দারা পালিয়ে কপিলী আর কিলিং নদীর সঙ্গমস্থল বসুন্ধরী বিলে পৌঁছান। কিন্তু তাতে হিতে বিপরীত হয়। তাঁদের চতুর্দিক থেকে ঘিরে ধরে গুলি করে মারতে থাকে দাঙ্গাকারীরা। এর মধ্যে অনেকে প্রাণ বাঁচাতে নদীতে ঝাঁপ দিলেও অন্যদিকে উঠতেই তাদের বল্লম দিয়ে খুঁচিয়ে বা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে খুন করা হয়। যাঁরা কোনো ভাবে জঙ্গলে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন, তাঁরা কোনো ভাবে তখন বেঁচে গেলেও, হিংসার ফলে পাওয়া আঘাতের কারণে তাঁদের জঙ্গলেই মৃত্যু হয়।

নেলি গণহত্যায় প্রাণে বাঁচা শিশু
ছবি সত্ত্ব: দ্যা স্যাটারডে স্টেটসম্যান / পদ্ম পাতার

মধ্যাহ্নে ছয় ট্রাক ভর্তি পুলিশ বাহিনী বসুন্ধরী বিলে হাজির হলে আক্রান্ত গ্রামবাসীরা মনে ভরসা পেলেও সেই ভরসা ক্ষণস্থায়ী হয়। কারণ হত্যাকারীদের আক্রমণ না করে পুলিশ গ্রামবাসীদের তাক করে গুলি চালানো শুরু করে। মাটি পর্বতের আব্দুল সাত্তার চন্দ কে জানান, “আশ্চর্যজনক ভাবে আমাদের উপর আক্রমণকারীদের গুলি না করে তারা (পুলিশ) আমাদের তাক করে গুলি চালানো শুরু করে। কোনো অজ্ঞাত কারণে পুলিশগুলো আমাদের দিকে নির্দয় হয়ে গুলি চালাতে থাকলো।” বাবুলালের থেকে আগাম খবর পেয়ে সাত্তারও তাঁর পরিবার কে বাঁচাতে সক্ষম হন।

সূর্য অস্ত যাওয়ার কিছু আগে সিআরপিএফ আসে। এই সিআরপিএফ বাহিনী কে দেখে দাঙ্গাকারীরা পালিয়ে যায়। তবে সিআরপিএফ তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে আর তাতে বেশ কিছু দাঙ্গাকারীরা মৃত্যু হয়। কিন্তু যতক্ষণে সিআরপিএফ এসে গ্রামবাসীদের বাঁচায় ও জাতীয় সড়কে নিয়ে যায় ততক্ষণে বিরাট ক্ষতি হয়ে গেছে নেলির। হাজার হাজার মানুষ মারা গেছেন, অসংখ্য পরিবার শেষ হয়ে গেছে। তবে মৃত্যু মিছিল এখানেই শেষ হয় না। এর পরে বহু মাস আক্রান্তদের ত্রাণ শিবিরে থাকতে হয় খুবই শোচনীয় অবস্থায়। সেখানে অসংখ্য শিশু পেটের সমস্যায় মারা যায় বলে গ্রামবাসীরা চন্দ কে জানান।

নেলি গণহত্যা: বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে  

নেলি গণহত্যা সংক্রান্ত ৬৮৮টি ফৌজদারি মামলা দায়ের করে পুলিশ। এর মধ্যে আবার ৩৭৮টি মামলা “প্রমাণের অভাবে” প্রত্যাহার করা হয় আর ৩১০টি মামলায় চার্জশিট জমা দেওয়া হয়। কিন্তু এরই মধ্যে দেশের রাজনীতিতে এমন কিছু ঘটে যার ফল ভোগ করেন এই গণহত্যায় আক্রান্ত ও নিহতদের পরিজনেরা।

১৯৮৪ সালের জুন মাসে শ্রীমতি গান্ধীর সরকার ভারতীয় সেনা বাহিনী কে অমৃতসরে অবস্থিত শিখ ধর্মের পবিত্র তীর্থস্থান স্বর্ণমন্দিরে খালিস্তানি জঙ্গী নিধনের জন্যে “অপারেশন ব্লু ষ্টার” নামক সামরিক অভিযান চালানোর অনুমতি দেয়। এর পরে সেনাবাহিনীর আক্রমণে সেখানে নিহত হন অসংখ্য সাধারণ শিখ ধর্মালম্বীরা ও বিশ্বজুড়ে এই ঘটনা একটি আলোড়ন সৃষ্টি করে। এর বদলা নিতে শ্রীমতি গান্ধীকে তাঁর বাসভবনেই সেই বছরের অক্টোবর মাসে গুলি করে হত্যা করে তাঁর শিক্ষা দেহরক্ষীরা। এই ঘটনার পরে দেশজুড়ে কংগ্রেস পার্টির প্ররোচনায় শিখ নিধন হয়।

এর পরেই নির্বাচনে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গড়েন শ্রীমতি গান্ধীর পুত্র রাজীব গান্ধী। ক্ষমতায় এসে গান্ধী আমলাদের সাহায্যে আসু ও অসম আন্দোলনের নেতৃত্বের সাথে অসম চুক্তি সই করেন ১৯৮৫ সালের অক্টোবর মাসে। এই চুক্তির ফলে একদিকে যেমন সরকার অসম আন্দোলনের দাবি মেনে বাঙালিদের ভোটাধিকার ও নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার পথ রাষ্ট্রীয় ভাবে স্বীকৃতি পায়, তেমনি অন্যদিকে নেলি গণহত্যা কাণ্ডের যে সকল মামলায় পুলিশ চার্জশিট জমা দিয়েছিল সেই সকল মামলাও প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

অন্যদিকে অসম আন্দোলনের থেকে কয়েকটি ধারার রাজনীতির উৎপত্তি হয়। একদিকে আসুর থেকে প্রফুল্ল মহন্ত প্রতিষ্ঠা করেন অসম গণ পরিষদের (অগপ), যে দল নির্বাচনে জিতে অসমে সরকার গড়ে, অন্যদিকে বিচ্ছিন্নতাবাদী ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অফ অসম (উলফা) সৃষ্টি হয় হিংসাত্মক আন্দোলন চালিয়ে যেতে। এছাড়াও আসু নিজের রাজনৈতিক কর্মকান্ড এই দুই সংগঠনের থেকে আলাদা ভাবে চালিয়ে যেতে থাকে।

কংগ্রেস যেহেতু তাঁদের বাঁচার অধিকার সুনিশ্চিত করতে পারেনি, তাই নেলি গণহত্যা কাণ্ডের পরে বেঁচে থাকা সেই অঞ্চলের মানুষ প্রাণ বাঁচাতে অগপ-র সাথে সমঝোতা করেন বলে চন্দ তাঁর রিপোর্টে উল্লেখ করেছিলেন। অগপ সরকার গঠন করার পরে অসম চুক্তি অনুসারে নেলি গণহত্যার বাকি মামলাও প্রত্যাহার করে নেয়, ফলে অপরাধীরা বুক ফুলিয়ে ঘুরতে থাকে অঞ্চলে।  

অন্যদিকে, নেলি গণহত্যা কাণ্ডে সরকারি খাতায় দেখানো ২,১৯১ মৃতদের পরিবার পিছু তৎকালীন সময়ে যেখানে ৫,০০০ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়, সিআরপিএফ-এর গুলিতে হত গণহত্যাকারীদের অগপ সরকার “শহীদ” হিসাবে স্বীকৃতি দেয়, ও তাদের পরিবার পিছু ৩৫,০০০ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেয় বলে গ্রামবাসীরা চন্দ কে জানিয়েছিলেন।

নেলি গণহত্যা ও বর্তমান ভারত  

নেলি গণহত্যা যেহেতু ১৯৮৪ সালের শিখ গণহত্যা, ১৯৯২ ও ২০০২ এর মুসলিম গণহত্যার আগে হয়েছিল তাই যেমন হিংস্রতার ক্ষেত্রে তেমনি রাষ্ট্রীয় উদাসীনতার ক্ষেত্রেও এই ঘটনা একটি পথপ্রদর্শক ভূমিকা পালন করেছিল, যা ভবিষ্যতের গণহত্যায় অংশ নেওয়া হত্যাকারীদের বলিষ্ঠ হওয়ার মানসিক শক্তি জুটিয়েছিল। রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট হয়ে যদি কোনো শক্তি গণহত্যায় অংশ নেয় তাহলে তারা যে আইনের ভয় ছাড়াই বুক ফুলিয়ে দিনের আলোয় অপরাধ করতে পারে সেই প্রমাণ ভারতে নেলি গণহত্যা কাণ্ড প্রথম দেখায়।

নেলি গণহত্যা কাণ্ডের সময় জ্বলে যাওয়া একটি বাড়ি যা ১৯৮৮ সালেও মেরামত করা হয়নি
ছবি সত্ত্ব: দ্যা স্টেটসম্যান/পদ্ম পাতার

এর পরে ব্রহ্মপুত্র দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। অসমের মাটি বারবার বাঙালির রক্তে লাল হয়েছে। ভীষণ রকমের বহিরাগত বিরোধী সেজে রাজনীতির আঙিনায় ঢোকা অগপ আর অন্যান্য তথাকথিত জাতীয়তাবাদী শক্তি বাঙালি বিরোধীতার সুর তীব্র করলেও হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান স্লোগান তুলে, হিন্দি ভাষা ও উত্তর ভারতীয় হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাব বিস্তারকারী বিজেপির লেজুড়ে পরিণত হয়েছে। তারা যদিও বা বিজেপি বিরোধিতা করে তবুও সেটা অসমের বাঙালিদের প্রতি বিদ্বেষ থেকে। বিগত কয়েক দশকে অসমের হিন্দি প্রীতি চরম ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

বর্তমানে বিজেপি শাসনাধীন অসমে বাঙালি মুসলিম আর হিন্দুদের মধ্যে বিদ্বেষের প্রাচীর তুলে এই জাতির অধিকারকে ক্ষুন্ন করার নানা অভিযোগ বিজেপির বিরুদ্ধে উঠেছে। এনআরসি করে, ফরেনার্স ট্রাইবুনালের মাধ্যমে অগণতান্ত্রিক ভাবে বাঙালি হিন্দুদের নাগরিকত্ব যেমন কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, তেমনি বুলডোজার চালিয়ে বা সাম্প্রদায়িক উস্কানি দিয়ে বাঙালি মুসলিমদের বিরুদ্ধে বারবার আক্রমণ নামিয়ে আনারও অভিযোগ তোলা হচ্ছে অসমে।

এই পরিস্থিতিতে, যখন বর্তমানের অধিকারই বাঙালিদের ক্ষুন্ন হয়েছে, সেখানে ৪০ বছর আগে সংগঠিত নেলি গণহত্যা কাণ্ডের শিকার হওয়া গরিব মানুষগুলোর জন্যে ন্যায় আশা করা অনেকটা বালখিল্যতা হয়ে যাবে। প্রায় ৩৫ বছর আগে যে ভাবে চন্দের রিপোর্টে অসমের অখ্যাত থেকে কুখ্যাত হওয়া নেলির ১৪টি গ্রামের মানুষের বেদনা পরিস্ফূটিত হয়েছিল সেই বেদনা কি আগামী দিনে নতুন করে নতুন প্রজন্মের চেতনায় আঘাত করবে, এই প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সময় কিন্তু এখনো হয়নি।

এই প্রবন্ধটি কি আপনার ভাল লেগেছে?

তাহলে মাত্র ৫০০ ভারতীয় টাকার থেকে শুরু করে আপনার সাধ্য মতন এই ব্লগটি কে সহযোগিতা করুন

যেহেতু আমরা FCRA-তে পঞ্জীকৃত নই, অতএব ভারতের বাইরের থেকে সহযোগিতা আমাদের পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব নয়।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

CAPTCHA


পিপলস রিভিউ বাংলা