ভারতের পাসপোর্ট ও নাগরিকত্বের প্রামাণ্য নথি: বিতর্কের নেপথ্যের আইন
সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের কর্তাদের পাসপোর্টকে নাগরিকত্বের প্রামাণ্য নথি হিসাবে অস্বীকার করা মন্তব্য একটি তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। একদিকে বিরোধী দলগুলো সরকারের এই অবস্থান কে ভারতের নাগরিকত্ব নিয়ে দেশের অসংখ্য মানুষকে, বিশেষ করে ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর) প্রক্রিয়া চলাকালীন, বিভ্রান্ত ও আতঙ্কিত করার প্রচেষ্টা হিসাবে সমালোচনা করেছে, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্ব বারবার সরকারের অবস্থানকে সমর্থন করে বলেছে যে পাসপোর্ট সংক্রান্ত এই অবস্থান ভারতের দীর্ঘকালীন নীতিগত সিদ্ধান্তের পরিণতি, এর সাথে নরেন্দ্র মোদীর ১২ বছরের শাসনকালের কোনো সম্পর্ক নেই।
এসআইআর, বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীদের “পুশব্যাক” করার নামে ভারতবর্ষ জুড়ে বাংলাভাষী মানুষের উপর পুলিশী দমনপীড়ন ও জাতীয় নাগরিক পঞ্জী (এনআরসি) প্রক্রিয়া নিয়ে মানুষের মধ্যে, বিশেষ করে বাংলাভাষী মানুষের মধ্যে, গেঁড়ে বসা আতঙ্কের কারণে মোদী সরকার ও বিজেপির উপর থেকে বিরোধীদের সন্দেহ সহজে দূর হবে না। তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের পাসপোর্টকে নাগরিকত্বের প্রামাণ্য নথি হিসাবে অস্বীকার করার সাথে কিন্তু সত্যিই মোদী সরকারের কোনো নীতিগত সিদ্ধান্তের সম্পর্ক নেই।
মোদীর আমলের বিতর্কিত নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন, ২০১৯, বা সিএএ ২০১৯, আইন হিসাবে ভারতের গ্যাজেটে প্রকাশিত হওয়ার আগের থেকে চলমান নাগরিকত্ব আন্দোলন, যা মূলত সিএএ-বিরোধী ও এনআরসি-বিরোধী আন্দোলন নামে পরিচিত, কিন্তু এই প্রশ্নগুলোকে জনসমক্ষে তুলে ধরেছিল। এই ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান ছিল পশ্চিমবঙ্গের নাগরিকত্ব আন্দোলনকারীদের। ভারতের নাগরিকত্বের প্রমাণ কী? —এই নিয়ে আড়াআড়ি ভাগ হয়ে গেছিল এনআরসি-বিরোধী আন্দোলন এবং তার সাথে যুক্ত নাগরিকত্বের প্রামাণ্য নথির প্রশ্নটি নিয়ে বিতর্ক।
ভারতের নাগরিকত্ব আইনের (১৯৫০ ও তার পরবর্তী সংশোধনী হিসাবে) সাথে ন্যায় বিভাগের নানা পর্যবেক্ষণ কিন্তু বারবার তুলে ধরেছে যে দেশটির নাগরিকদের কাছে থাকা কোনো দলিল একক ভাবে তাঁদের ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ করে না। ঠিক এই কারণেই এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সারা দেশে কয়েক কোটি মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে। ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অনেক বিরোধী দল পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুললেও, বর্তমান আইনের পরিধির মধ্যে থেকেই কিন্তু কমিশন এই কর্মকাণ্ড চালাতে পেরেছে, সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ সত্ত্বেও।
ভারতের নাগরিকত্বের প্রামাণ্য দলিল হিসাবে পাসপোর্ট কেন গণ্য নয়?
ভারতের পাসপোর্ট বানানোর প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল ও সময় সাপেক্ষ। পরিচয় ও বাসস্থানের ঠিকানার নানা নথি খতিয়ে দেখে ও পুলিশের খাতায় আবেদনকারীর নামে কোনো মামলা রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখেই পাসপোর্ট তৈরি হয়। কিন্তু পাসপোর্ট হাতে একজন ভারতীয় যখন অন্য কোনো দেশে যান তখন তিনি ভারতীয় নাগরিক হিসাবে স্বীকৃতি পেলেও, এই নথি দেখিয়ে ভারতের অভ্যন্তরে নাগরিকত্ব প্রমাণ হয় না। এই পাসপোর্ট শুধু ভারতীয় নাগরিক নয়, অনেক সময় অনেক বেনাগরিকও আইনত পেয়ে থাকতে পারেন। এবং ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের দাবিটি, যে পাসপোর্ট শুধুই একটি বিদেশ ভ্রমণের সহায়ক নথি, নাগরিকত্বের প্রামাণ্য নথি নয়, এই ক্ষেত্রে সঠিক।

২০১৩ সালে বোম্বে হাই কোর্টের বিচারক জাস্টিস কেইউ চান্দিওয়াল একটি মামলায় রায় দেন যে ভারতের ভিতর পাসপোর্ট নাগরিকত্বের কোনো প্রামাণ্য নথি নয়। এর আগে যদিও সুপ্রিম কোর্ট পাসপোর্টকে জাতীয়তার প্রমাণ হিসাবে গণ্য করেছিল, কিন্তু তার সাথে যোগ করেছিল জন্মের নথি, প্রভৃতি আইনত জরুরী দলিলগুলোকে। ২০১৫ সালের বাবুল ইসলাম বনাম অসম রাজ্যের মামলায় গৌহাটি হাই কোর্ট রায় দিয়েছিল যে ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড প্রভৃতি নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। বিশেষত যেহেতু ভারতে জাল নথি দিয়ে সরকারি পরিচয়পত্র বানানো যায় বলে অভিযোগ রয়েছে, তাই পাসপোর্ট ও অন্য পরিচয়ের দলিলকে নাগরিকত্বের প্রামাণ্য নথি হিসাবে মানা হয় না।
২০০৫ সালে সর্বানন্দ সোনোওয়াল বনাম ভারত ইউনিয়নের মামলায় সুপ্রিম কোর্ট নাগরিকত্ব প্রমাণের দায় নাগরিকদের উপর ঠেলে দিয়েছিল, যার ফলে যদিও ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে একজন অভিযুক্তকে অপরাধ প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ মানা হয় এবং তাঁদের জন্যে জামিনের আবেদন করা যায়, নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে যতক্ষণ না অভিযুক্ত নিজেকে নির্দোষ প্রমাণিত করবেন না, ততক্ষণ তাঁকে দোষী, অর্থাৎ বেআইনী অভিবাসী, হিসাবে গণ্য করা হবে।
ভারতের নাগরিকত্বের প্রামাণ্য দলিল কী?
ভারতের নাগরিকত্ব আইনের দুটি সবচেয়ে বড় ধরণের সংশোধনী হয় ১৯৮৬ ও ২০০৩ সালে। প্রথমটি, অর্থাৎ ১৯৮৬ সালের সংশোধনী (যা ১৯৮৭ থেকে প্রয়োগ করা হয় বলে সিএএ ১৯৮৭ বলা হয়) জন্মসূত্রে ভারতের নাগরিক হওয়ার সুযোগ শেষ করে দেয়। তার জায়গায় ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি থেকে ১৯৮৭ সালের ১লা জুলাই পর্যন্ত জন্ম নেওয়া প্রত্যেককে জন্মসূত্রে ভারতের নাগরিক মানলেও—যার প্রমাণ হিসাবে তৎকালীন সময়কার জন্ম সার্টিফিকেট ও অন্যান্য নথি থাকা জরুরী — তার পর থেকে জন্মানো প্রত্যেকের ক্ষেত্রে তাঁদের মা-বাবার মধ্যে একজন কে ভারতীয় নাগরিক হওয়ার উক্ত প্রমাণ দেখাতে হবে।


মূলত অসমের বাঙালি খেদাও আন্দোলন থেকে সৃষ্ট অসম আন্দোলনের ফলে কেন্দ্রীয় সরকার ও সারা অসম ছাত্র ইউনিয়নের (আসু) মধ্যে হওয়া সমঝোতার ভিত্তি ছিল অসমে বাংলাদেশ থেকে আগত বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তুদের সনাক্তকরণ, তাঁদের নাম নির্বাচনী তালিকা থেকে বাতিল করা ও তাঁদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো। সেই কারণেই “বেআইনী অনুপ্রবেশকারী” নামক বয়ানটি অসমের রাজনীতির থেকে গত শতকের নয়ের দশকে ভারতের মূলস্রোতের রাজনীতিতে জায়গা করে নেয়। আর সেই জায়গাটা করে দেয় উগ্র দক্ষিণপন্থী হিন্দুত্ববাদী শক্তি, যার একটি ধারা হলো মোদীর বিজেপি।
কিন্তু এই রাজনীতির ফসল আরও মারাত্মক হলো ২১ শতকের শুরুতে।
ডিসেম্বর ২০০৩-এ বিজেপির অটল বিহারি বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটের (এনডিএ) সরকার সিএএ ২০০৩ পাশ করে সংসদের দুই কক্ষে। মোদী আমলের সিএএ ২০১৯-র বিরুদ্ধে যদিও বিরোধীরা নানা ধরণের প্রতিবাদ করেছিল, সিএএ ২০০৩-র বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ হয়নি, বরং কংগ্রেসের তৎকালীন নেতা প্রণব মুখার্জীর তত্ত্বাবধানে, রাজ্য সভার ১০৭তম কমিটি সহমতের ভিত্তিতে এই আইনকে সমর্থন করে। তৎকালীন সময়ের তৃণমূল কংগ্রেস-সমর্থিত এনডিএ সরকারের পাশ করা, মোদীর সিএএ ২০১৯-র চেয়ে বাংলাভাষী জনগণের জন্যে অত্যন্ত বিপদজনক এই আইন প্রণয়ন করে বাম-সমর্থিত কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জাতীয় প্রগতিশীল জোট (ইউপিএ) সরকার ডিসেম্বর ২০০৪-এ।
এনডিএ ও ইউপিএ শাসনকালেই ভারতের অসংখ্য প্রামাণ্য দলিল ও নথিহীন জনগণকে বেনাগরিক করে দেয় সিএএ ২০০৩। এই আইনের নিয়মাবলী অনুসারে দেশজুড়ে এনআরসি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেই ভারতের নাগরিকত্বের প্রামাণ্য দলিল তৈরি হবে। অর্থাৎ সিএএ ২০০৩ অনুসারে এনআরসি হবে নাগরিকত্বের একমাত্র পরিচয়।
এই প্রক্রিয়ার প্রাথমিক ধাপ জাতীয় জনসংখ্যা পঞ্জির (এনপিআর) কাজ শুরু করে ইউপিএ সরকার ২০১০ সাল নাগাদ। এর জন্যেই সরকার তখন আধার ব্যবস্থা কে তৈরি করে। এই আধারের সাথে বাকি সব পরিচয়পত্র ও দলিলের সংযুক্তি করে মোদীর এনডিএ সরকার। আর এই আধারের সাথে জন্মের স্থানের তথ্য ও পরিবারের ভোটার তথ্য জুড়ে যে এসআইআর প্রক্রিয়া চলছে তার ফলে জাতীয় জনগণনা পশ্চিমবঙ্গে শুরু হওয়ার আগেই প্রাথমিক ভাবে এই সংক্রান্ত তথ্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে চলে এসেছে। ফলে আগামী দিনে এনপিআর তথ্যের ভিত্তিতে এনআরসি তৈরি করা সহজ হয়ে যাবে বলে এনআরসি-বিরোধী আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করছেন।
এই পরিপ্রেক্ষিতে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের পাসপোর্টকে নাগরিকত্বের প্রামাণ্য নথি হিসাবে মানতে না চাওয়ার ঘটনা সত্যিই মোদী সরকারের সিদ্ধান্তের সাথে জড়িত নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে ভারতবর্ষের সমস্ত মূলস্রোতের দলগুলোর বাঙালি-বিরোধী মনোভাবের ফসল থেকে সৃষ্ট সিএএ ২০০৩-র পরিণাম। বর্তমানে এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যে ভাবে কোটি কোটি পশ্চিমবঙ্গ বাসীকে হেনস্থা করা হয়েছে ও প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে লজিক্যাল ডিস্ক্রেপানসির নামে, তেমন ভাবেই জনগণনা ও এনপিআর প্রক্রিয়ার পরে এনআরসি তৈরির জন্যে আরও হেনস্থা করা হবে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি ও অন্যান্য ভূমিপুত্রদের, সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মীরা আশঙ্কা করছেন। তাঁরা মনে করছেন গোটা দেশে প্রায় ৮% থেকে ১০% প্রান্তিক মানুষকে, ও পশ্চিমবঙ্গ ও অসমে ব্যাপক হিন্দু উদ্বাস্তুদের বেনাগরিক করে ফেলবে এনআরসি প্রকল্প, এবং তাঁদের আশঙ্কা হলো যে এর ফলে দেশে নাকি একটি বিরাট সস্তা শ্রমের ভাণ্ডার সৃষ্টি করা সম্ভব হবে কর্পোরেট-বন্ধু হিসাবে অভিযুক্ত বিজেপির।
তবে যতদিন এনআরসি প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত ভুয়া নথি দিয়ে তৈরি হয় এই অভিযোগে ভারতের পাসপোর্ট কে সরকার কোনো ভাবেই দেশের ভিতর নাগরিকত্বের প্রামাণ্য নথি হিসাবে স্বীকৃতি দেবে না। বিরোধী দলগুলির কর্মকাণ্ড মোদী সরকারকে আক্রমণ করায় সীমিত থাকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে এবং এর ফলে নাগরিকত্বের সঙ্কট তৈরি হওয়ার পিছনে বিজেপির সাথে যে ডান থেকে বাম সব পক্ষ জড়িত সেই ঘটনা লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে যাবে।

