“দিমাগি নকশাল” শিকার করতে যাদবপুরে গেরুয়া হামলা
স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লার থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যখন বলেছিলেন, বন্দুকধারী নকশাল নিকেশ হলেও “দিমাগি নকশাল”—যাদের অস্ত্র মাথা, বন্দুক নয়—এখনও বিপজ্জনক, তখন কথাটা অনেকের কাছেই নিছক রাজনৈতিক বয়ানবাজি মনে হয়েছিল। পাঁচ দিনের মাথায়, বুধবার রাতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে তরোয়াল আর লাঠি হাতে যে জনতা অরবিন্দ ভবনের দিকে ছুটে গিয়েছিল, বামপন্থী পড়ুয়া সংগঠনের পতাকা পুড়িয়েছিল, তারা প্রমাণ করে দিল—কথাটা অলঙ্কার ছিল না, ছিল হিন্দুত্ববাদী শক্তির কর্মসূচি।
ঘটনার সূত্রপাত বুধবার সন্ধ্যায়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেটসু-র (ফ্যাকাল্টি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন) একটি সাধারণ সভাকে ঘিরে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) পড়ুয়া সংগঠন অখিল ভারত বিদ্যার্থী পরিষদের (এবিভিপি) দাবি, তাদেরই কর্মী নিখিল দাসকে বামপন্থী পড়ুয়া সংগঠন ভারতের ছাত্র ফেডারেশন (এসএফআই), অখিল ভারত গণতান্ত্রিক ছাত্র সংগঠন (ডিএসও), ও গণতান্ত্রিক ছাত্র ফেডারেশনের (ডিএসএফ) সদস্যরা মারধর করেছেন; বামপন্থীদের পাল্টা দাবি, বহিরাগত এনেছিল এবিভিপি নিজেই। কিন্তু কার আগে কে মেরেছিল, তার হিসেব কষার চেয়েও জরুরি প্রশ্ন হল—তার পরে কী হয়েছিল।
মধ্যরাতে তরোয়াল-লাঠি হাতে একটি উন্মত্ত জনতা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের গেট ভেঙে অরবিন্দ ভবনের দিকে এগিয়ে যায়, যেখানে বামপন্থী ছাত্রছাত্রীরা জড়ো হয়েছিলেন। আগুন জ্বলে ক্যাম্পাসের একাধিক জায়গায়, পতাকা পোড়ে, আর বৃহস্পতিবার দুপুরে নন্দলাল বসুর আঁকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীক-ফলকটি খুলে ছুড়ে ফেলা হয় তালাবন্ধ গেটের ওপার থেকে এপারে।
বৃহস্পতিবারই গোলপার্ক থেকে মিছিল করে আসা এবিভিপি সমর্থকেরা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে ৪ নম্বর গেটে পৌঁছে যান, ডিম-জলের বোতল-লাঠি ছোড়েন তালাবন্ধ গেটের ওপারে বসে থাকা বাম ছাত্রছাত্রীদের দিকে।
অন্যদিকে নির্লিপ্ত পুলিশ ও রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট অতি-দক্ষিণপন্থী আরএসএস বাহিনীর বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দিতে একত্রিত হতে থাকে দলমত নির্বিশেষে সমস্ত বামপন্থী পড়ুয়ারা। এর মধ্যে এসএফআই যদিও ফেটসুর সাধারণ বৈঠকে থাকার কথা অস্বীকার করেছে, তবুও সংগঠনটির কর্মী ও সমর্থকেরা অন্যান্যদের সাথে হাত মিলিয়ে আক্রমণ প্রতিহত করার প্রচেষ্টা করেছে বলে নেতৃবৃন্দ সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন।
প্রশ্রয়ের ভাষা
এই সবটাই হয়তো নেহাতই কয়েকটি ছাত্র সংগঠনের সংঘর্ষ বলে চালিয়ে দেওয়া যেত, যদি না রাজ্যের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল সেই রাতেই সমাজমাধ্যমে লিখতেন, “দিমাগি নকশাল”-দের বিরুদ্ধে আদর্শগত লড়াই চলবে। প্রধানমন্ত্রীর মুখের শব্দবন্ধ পাঁচ দিনের মধ্যে রাজ্যের এক মন্ত্রীর হাত ধরে যাদবপুরের গেটে এসে পৌঁছল—এটা কাকতালীয় নয়, এটাই ছক।
মোদীর ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতা দিলীপ ঘোষ বহু আগেই যাদবপুরকে “অসভ্য বানানোর কারখানা” বলে চিহ্নিত করেছিলেন, মোদীরই সুরে; আজ সেই সুরই রাজ্য প্রশাসনের ভাষা হয়ে উঠেছে। উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য তদন্ত কমিটি আর রাতে বহিরাগত-নিষেধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কিন্তু ২০২০ সাল থেকে বন্ধ থাকা ছাত্র সংসদ নির্বাচন কেন হয়নি, তার জবাব দেননি।
এই দমন-পীড়নের প্রকল্প নতুন নয়, শুধু তার লক্ষ্য বদলেছে। এক দশকের বেশি সময় ধরে বিজেপি ও তার পিতৃতুল্য সংগঠন আরএসএস যাদবপুর, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (জেএনইউ), জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া (জেএমআই), হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে “বাম-ইসলামি চক্রান্তের ঘাঁটি” বলে দেগে দিয়েছে, প্রতিটি অভিযোগ পরের দমনের রাস্তা করে দিয়েছে।
২০১৬ সালের হায়দ্রাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের দলিত ছাত্র রোহিত ভেমুলার মৃত্যুর থেকে যে ভাবে এবিভিপি ও রাষ্ট্র ক্ষমতা কে ব্যবহার করে আরএসএস ও বিজেপি প্রতিটি শিক্ষাঙ্গনে নিজের প্রতিপত্তি কায়েম করার লড়াই শুরু করেছে তার জেরে কখনো জেএনইউ তো কখনো জেএমআই তো কখনো যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে হিন্দুত্ববাদী শক্তির রোষানলে পড়তে হয়েছে। কখনো “শহুরে মাওবাদী”, কখনো “টুকরে টুকরে গ্যাং”, কখনো “রাষ্ট্রদ্রোহী” বা কখনো “দিমাগি নকশাল” তকমা জুড়ে এই আক্রমণগুলো কে অতি-দক্ষিণপন্থী শক্তি যৌক্তিকতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে, বামপন্থী ছাত্র সংগঠকদের একাংশ এই অভিযোগ করেছেন।
একটি প্রজন্মের বিরুদ্ধে
অখিল ভারত ছাত্র সংগঠন (আইসা) জুন-জুলাই মাসের নয়া দিল্লীর যন্তর মন্তরে পরীক্ষা ব্যবস্থার গাফিলতির বিরুদ্ধে আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিল। সম্প্রতি তাদের নেত্রী নেহা বোরা অভিযোগ করেছেন যে এইবারের আন্দোলনের সাথে অন্যগুলোর পার্থক্য হলো যে এই সময়ে সরকার-বিরোধিতার পরিধিটা অনেক বড়। এই আন্দোলন, যা প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে শেষমেশ শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা আদায় করে ছেড়েছিল, জেন জি আন্দোলন নামে পরিচিতি পেয়েছে ব্যাপক যুব সমাজের অংশগ্রহণে।
রাহুল গান্ধী-সহ বিরোধী নেতারা বলছেন, সরকার এমন এক প্রতিপক্ষের মুখোমুখি, যাকে আগে কখনও একরঙা তকমা দিয়ে দাগানো যায়নি—নাগরিকত্ব আন্দোলনে মুসলিমদের বা ২০২০-২১-এর কৃষক আন্দোলনে শিখ-জাঠদের যেভাবে দাগানো গিয়েছিল, তার উলটো: এবার প্রতিপক্ষ গোটা একটা প্রজন্ম। এই প্রজন্মকে কী করে শায়েস্তা করতে হবে সেটা মোদী ও তাঁর সাগরেদরা জানেননা বলে কটাক্ষ করেছেন বোরা এবং অন্যান্য নেতৃত্ব।
এই প্রজন্মের বড় অংশই বিজেপির চেনা শত্রু নয়। অনেকেই উচ্চবর্ণ হিন্দু পরিবারের সন্তান; আইসা নেত্রী বোরার মতো কারও কারও পরিবার তো ঘোর মোদী-সমর্থক। ২০ জুলাই সংসদ অভিযানে পুলিশি বলপ্রয়োগ আগুনে ঘি ঢালে, আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে মুম্বই-বেঙ্গালুরু-কলকাতা-সহ দেশজুড়ে। বিহার-উত্তরপ্রদেশের হিন্দু তরুণেরা—বিজেপির নিজস্ব ভোটব্যাঙ্ক—যখন পথে নামলেন, তখন দলের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল, মেরুকরণের অস্ত্র দিয়ে এই ফাটল সারানো যাবে না।
ইনস্টাগ্রাম রিল আর সরকারের প্রতি “তরুণ প্রজন্মের ভালোবাসা” দেখানো বিজ্ঞাপনের জবাবে এল কেবল বিদ্রুপ—যে প্রজন্ম টিভি দেখে না, তাকে টিভি-অ্যাঙ্করের গলাবাজি দিয়ে বশ করা যায়নি। তখনই এল মোদীর “দিমাগি নকশাল”—চাটুকারিতা ব্যর্থ হলে যা অবশিষ্ট থাকে, তা হল দাগিয়ে দেওয়া।
১৫ অগস্ট কলকাতাতেই ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) [সিপিআই(এম-এল)] লিবারেশনের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য বলেছিলেন, মোদীর এই মাপকাঠিতে জ্যোতি বসুকেও আজ “নকশাল” বলা যেত। কথাটা তিনি বলেছিলেন যাদবপুরেরই মোড়ে, এমন একটি কেন্দ্রে যেখানে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা নগণ্য, আর যা গত বিধানসভা ভোটে বিজেপিকেই জিতিয়েছে।
কিন্তু ভট্টাচার্য যে মঞ্চ থেকে কথা বলছিলেন সেটি সিপিআই(এম-এল) লিবারেশনের নয়, বরং বামফ্রন্টের ঐক্যবদ্ধ একটি রাজনৈতিক অনুষ্ঠান ছিল। আর সেই রাজনৈতিক মঞ্চতে দেখা গেছিল একটি অভূতপূর্ব ঐক্যের ছবি যা পশ্চিমবঙ্গের বাম রাজনীতিতে বিরল। যদিও বর্তমানে বাম আন্দোলন নানা ভাগে ভাগ হয়ে অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে এবং সর্বসাকুল্যে সিপিআই(মার্কসবাদী) গত বিধানসভা নির্বাচনে একটিই আসন পশ্চিমবঙ্গে জিততে পেরেছে, তবুও তৃণমূল কংগ্রেসের খড়কুটোর মতন ভেসে যাওয়ার পরে এই বামপন্থী শক্তিই রাস্তার বিরোধীর ভূমিকা পালন করছে। আর তাই সেই বিরোধীকে কুপোকাৎ করতে বিজেপির বামপন্থীদের “দিমাগি নকশাল” বলে চিহ্নিত করার থেকে শুরু করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা সবই একটি অবাধ্য প্রজন্মকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার অবিচ্ছিন্ন কর্মসূচি হিসাবেই রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞেরা দেখছেন।
অসংগতিই কৌশল
ভট্টাচার্য, আইসা আর এসএফআই আজ অভূতপূর্ব ভাবে মিলিত সুরেই বলছেন যে মোদীর “দিমাগি নকশাল” কোনও নির্ণয় নয়, একটি লাইসেন্স। এই লাইসেন্স দিয়ে লখনউয়ের অঙ্কের ছাত্র, মুজফ্ফরপুরের কৃষক-সন্তান, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে নবাগত ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়া আর প্রয়াত এক কমিউনিস্ট নেতাকে একই ষড়যন্ত্রের শরিক বানিয়ে দেওয়া যায়—এক ষড়যন্ত্র, যার অর্থ নাকি আসে “ডিপ স্টেট” থেকে, জর্জ সোরোসের পকেট থেকে, আবার পালা করে পাকিস্তান-চিন-আমেরিকার তহবিল থেকেও।
এই অভিযোগপত্রের সংগতি থাকার দরকার নেই, কারণ তার কাজ যুক্তি দেওয়া নয়। সোরোস আর বেজিং মিত্র নয়; ওয়াশিংটন তো বেজিংয়ের প্রকাশ্য প্রতিপক্ষ, তার এজেন্ট নয়; পাকিস্তানের অর্থনীতির কথা উঠলে ঘোড়ায় হাসবে। তবুও এই চারটি শক্তি একসঙ্গে একটি ছাত্র আন্দোলন চালাচ্ছে—গুপ্তচরবৃত্তির ইতিহাসে এর চেয়ে অসম্ভব যৌথ উদ্যোগ আর হয়নি। কিন্তু যুক্তিসংগতি কখনও আরএসএস-এর লক্ষ্যই ছিল না। হিন্দুত্ববাদী শক্তির লক্ষ্য হল, ভিন্নমতকে অপাঠ্য করে তোলা—একজন কৃষক-সন্তান, একজন প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রীর স্মৃতি, আর একজন বিজেপি-ভোটারের মেয়েকে একই, বাতিলযোগ্য শত্রুতে পরিণত করা, যাতে একজনকে দমন করলেই বাকি সবাইকে চুপ করানো যায় — বামপন্থী নেতৃত্ব অভিযোগ করে থাকেন।
নন্দলাল বসুর আঁকা প্রতীক-ফলকের লোহার কাঠামোটা এখনও পড়ে আছে, যেখানে সেটা ছুড়ে ফেলা হয়েছিল। ২০১৯ সালে মোদীরই এক মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘিরে রেখেছিলেন যাদবপুরের ছাত্রছাত্রীরা; ২০২৫-এর মার্চে ঘেরাও হয়েছিলেন তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুও। যাদবপুরের ক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়ানোর অভ্যাসটা নতুন নয়। নতুন হল, রাজ্যের সরকার এখন সেই জেদের জবাব দিচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর মুখের সেই একই শব্দ দিয়ে, যা লালকেল্লার প্রাকার থেকে উচ্চারিত হয়েছিল। বুধবার রাতে আর বৃহস্পতিবার দুপুরে, দুই দফায় যাদবপুরের ছাত্রছাত্রীরা তারই মূল্য চুকিয়েছেন। তাঁরাই শেষ নন।

