স্বাধীনতা দিবস: মোদীর বিজেপি-কে তাড়া করে বেড়াচ্ছে ‘আজাদি’
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যখন ভারতের ৮০তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ১৫ অগস্ট তাঁর “হর ঘর তিরঙ্গা” (প্রতিটি বাড়িতে জাতীয় পতাকা) অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য জোর দিচ্ছেন, তখন তাঁর দক্ষিণপন্থী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-র বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে “আজাদি” — উর্দুতে স্বাধীনতা বোঝাতে ব্যবহৃত এই শব্দটিকে আক্রমণ করার। বাম শক্তি ও অন্যান্য বিরোধী গোষ্ঠীগুলির রাজনৈতিক স্লোগান হয়ে ওঠার পরই এই আক্রমণ শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ।
মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার নিজেই ভারতের স্বাধীনতার ৭৫তম বার্ষিকী পালনের জন্য ২০২১ সালের মার্চ মাসে “আজাদি কা অমৃত মহোৎসব” (স্বাধীনতার অমৃত) নামে একটি অভিযান শুরু করেছিল, এবং ২০২২ থেকে ২০৪৭ সালের মধ্যবর্তী সময়কে “অমৃত কাল” (শুভ যুগ) বলে চিহ্নিত করেছিল। তা সত্ত্বেও, বিরোধীরা যখনই “আজাদি”-কে স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করেছে, সরকার ও শাসক দল প্রতিবারই তার প্রতি বৈরী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।
এই শব্দটি নিয়ে সাম্প্রতিকতম সংঘাত — যা প্রথম জাতীয় স্তরে আলোড়ন তুলেছিল ২০১৬ সালে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (জেএনইউ)-এর ছাত্র বিক্ষোভের সময়ে — সামনে এসেছে নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে বারবার পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে ৩৬ দিন ধরে চলা ছাত্র আন্দোলনে। এই আন্দোলনের আয়োজক, ইন্টারনেট মিম আন্দোলন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি), “আজাদি” ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও বহু ছাত্র ও বিক্ষোভকারী এই স্লোগান তুলেছেন।
এই ঘটনাগুলিকে কাজে লাগিয়ে ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যম — যাদের একটা বড় অংশের বিরুদ্ধে মোদী ও বিজেপি-ঘেঁষা হওয়ার অভিযোগ রয়েছে — এই তরুণ বিক্ষোভকারীদের, যাঁদের সাধারণভাবে “জেন-জি” বলা হয়, “দেশদ্রোহী” এবং “বিদেশি অর্থপুষ্ট” বলে দাগিয়ে দিয়েছে, শাসকগোষ্ঠীর পরিচিত ছকই অনুসরণ করে।
“আজাদি” শব্দটির প্রতি বিজেপি-র বৈরিতা সত্ত্বেও, ২০১৬ সাল থেকে গোটা দেশ জুড়ে এই শব্দটি ক্রমশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে — যা ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক উভয় কারণেই এই শব্দের ঘোর বিরোধী দলটির জন্য একটি সমস্যা।
আজাদির শিকড় এখনও সমস্যাজনক
বিজেপি বিপুল ঢক্কানিনাদ সহকারে “আজাদি কা অমৃত মহোৎসব”-এর প্রচার চালিয়েছে, যার ফলে বিরোধীদের “আজাদি” শব্দের ব্যবহার দলটির কাছে দ্বিগুণ অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিজেপি ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আরএসএস)-এর নেতৃত্বাধীন বৃহত্তর হিন্দুত্ব শিবিরের কাছে এই স্লোগানের উৎসই প্রথম সমস্যা। এর শিকড় কাশ্মীর উপত্যকায়, জাতিসংঘ-স্বীকৃত একটি বিতর্কিত ভূখণ্ড, যা পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিনের সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু। আশির দশকের শেষ ও নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় উপত্যকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়া গণআন্দোলনের প্রধান দাবি হয়ে উঠেছিল “আজাদি” বা স্বাধীনতা, যার সঙ্গে জঙ্গি তৎপরতাও বৃদ্ধি পেয়েছিল।
মোটামুটি অনুবাদ করলে, “হম কেয়া চাহতে? আজাদি” — অর্থাৎ “আমরা কী চাই? স্বাধীনতা” — এই স্লোগান বিতর্কিত ভূখণ্ডের উপর ভারতের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানায়, যা আরএসএস-নেতৃত্বাধীন হিন্দুত্ব শিবিরের কাছে অগ্রহণযোগ্য। ২০১৬ সালে একই স্লোগান কাশ্মীরের রাস্তায় ফিরে আসে, যখন পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (পিডিপি)-র নেতৃত্বাধীন রাজ্য জোট সরকারে বিজেপি ছিল ছোট শরিক। নিরাপত্তা বাহিনী কঠোরভাবে বিক্ষোভ দমন করার সময় শিশু ও মহিলা-সহ শয়ে শয়ে বিক্ষোভকারী পেলেট আঘাতে জখম হন।
সেই একই বছরে, কাশ্মীর থেকে বহু দূরে রাজধানীর জেএনইউ-তেও এই স্লোগান ফিরে আসে, যা বিজেপি-র জন্য যথেষ্ট বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পিডিপি-র সঙ্গে দলটির জোট ২০১৮ সালের মধ্যে ভেঙে যায়, যখন প্রাক্তন এই রাজন্য-রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়, কিন্তু স্লোগানটি বিজেপি ও আরএসএস-কে তাড়া করতে থাকে।
জম্মু ও কাশ্মীরে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বিক্ষোভ দমন করা অপেক্ষাকৃত সহজ প্রমাণিত হয়েছে, বিশেষত ২০১৯ সালের অগস্টে অঞ্চলটির বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার পর থেকে। কিন্তু সেই বছরের শেষদিকে মোদীর বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে দেশজোড়া বিক্ষোভের সময় “আজাদি” ফের রাস্তায় ফিরে আসে। এই আন্দোলন স্লোগানটিকে আন্তর্জাতিক পরিসরেও নিয়ে যায়, ভারতে মুসলিমদের প্রতি আচরণ সংক্রান্ত উদ্বেগের সঙ্গে জুড়ে দেয়, যা মোদী সরকারের জন্য নতুন সমস্যা তৈরি করে।
আজাদির ধারণাই বিপদ ডেকে আনে
কাশ্মীরের বাইরে, স্লোগানের একটি রূপান্তরিত সংস্করণ — যা ক্ষুধা, দারিদ্র্য, জাতপাত ও শ্রেণি নিপীড়ন, এবং পিতৃতন্ত্র থেকে মুক্তি দাবি করে — বিজেপি ও আরএসএস-এর মূল বিশ্বাস ব্যবস্থার সামনে আরও গভীর চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে।
হিন্দুত্ব মতাদর্শ ব্রাহ্মণ্যবাদী ঐতিহ্যে প্রোথিত একটি স্তরবিন্যস্ত সামাজিক ব্যবস্থার প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের উপর দাঁড়িয়ে আছে। এটি বাধ্যতা দাবি করে এবং পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পর্যন্ত যে কোনও স্তরে কর্তৃত্বকে প্রশ্ন করাকে নিরুৎসাহিত করে; কর্তৃত্বকে সর্বোচ্চ, অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও দায়বদ্ধতাহীন হিসেবে গণ্য করা হয়। সমালোচকদের যুক্তি, দায়বদ্ধতা এড়িয়ে চলার এই প্রবণতা — মতাদর্শের অন্যান্য প্রতিক্রিয়াশীল দিকগুলির পাশাপাশি — মোদী সরকার ঠিক যা হয়ে উঠেছে তারই প্রতিফলন।
বিজেপি এই অভিযোগ অস্বীকার করে, এবং ১৯৭৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জাতীয় জরুরি অবস্থা জারি করলে দলটির পূর্বসূরি জনসঙ্ঘ ও আরএসএস যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, তার উদাহরণ দেয়। কিন্তু সমালোচকদের মতে, তারপর থেকে দলটির কর্মকাণ্ড ইঙ্গিত দেয় ভারতীয় রাজনীতিতে একটি কর্তৃত্ববাদী মডেলকে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠিত করার এক গভীরতর উচ্চাকাঙ্ক্ষার।
অন্যদিকে, বামপন্থীরা কাশ্মীরি “আজাদি” স্লোগানটি গ্রহণ করেছে, তবে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের অন্তর্নিহিত দাবিটি বাদ দিয়ে। তা সত্ত্বেও, ২০১৬ সালের জেএনইউ বিক্ষোভে কথিত বিচ্ছিন্নতাবাদী স্লোগানের উল্লেখ করে বিজেপি বামপন্থীদের বিরুদ্ধে ভারত ভাঙার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলে। ওই স্লোগানের প্রমাণ হিসেবে দেখানো ভিডিওটি পরে সম্পাদিত (ডক্টর্ড) বলে প্রমাণিত হলেও, বিজেপি ও সরকারপন্থী সংবাদমাধ্যম রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ চালিয়ে যায়।
যেহেতু আরএসএস-নেতৃত্বাধীন হিন্দুত্ব শিবিরের প্রধান আদর্শগত প্রতিপক্ষ বামপন্থীরা, তাই বিজেপি, মোদী সরকার ও সহানুভূতিশীল সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলি যাঁরা ভারতের শ্রমজীবী মানুষের সামাজিক-অর্থনৈতিক মুক্তির দাবিতে “আজাদি” স্লোগান তোলেন, তাঁদের অপবাদ দিতে থাকে। বামপন্থীরা বিজেপি-র বয়ান ও “টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং” (ভারতকে টুকরো করার চেষ্টায় লিপ্ত একটি দল) সংক্রান্ত অভিযোগের বিরুদ্ধে পাল্টা যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করেছে, কিন্তু সমালোচকদের মতে, সরকারের বয়ানের প্রতি অনুগত টেলিভিশন সঞ্চালক ও সমাজমাধ্যম প্রভাবকদের রবে চাপা পড়ে সেই পাল্টা যুক্তি খুব কমই বৃহত্তর দর্শকের কাছে পৌঁছয়।
আজাদি কোন দিকে?
মোদী সরকার একদিকে “আজাদি কা অমৃত মহোৎসব” উদযাপন করছে এবং স্বাধীনতার শতবর্ষের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময়কালকে “অমৃত কাল” বলে অভিহিত করছে, অন্যদিকে সমালোচকরা একই সময়কালে নাগরিক অধিকারের সমান্তরাল ক্ষয়ের দিকে ইঙ্গিত করেন।
২০২৩ সালের জুন মাসে অন্ধ্রপ্রদেশের একটি অনুষ্ঠানে মোদী ২০৪৭ পর্যন্ত এগিয়ে চলা সময়কালকে “কর্তব্য কাল” — অর্থাৎ কর্তব্যের সময়কাল — বলে বর্ণনা করেন, যে সময়ে নাগরিকদের অধিকারের চেয়ে তাঁদের মৌলিক কর্তব্যের উপর মনোনিবেশ করা উচিত। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে আজাদি কা অমৃত মহোৎসব সংক্রান্ত একটি অনুষ্ঠানে তিনি একই ধরনের মন্তব্য করেছিলেন, বলেছিলেন যে অধিকারের উপর অতিরিক্ত জোর দেওয়া স্বাধীনতার প্রথম ৭৫ বছরে দেশকে দুর্বল করে দিয়েছে।
এই মন্তব্যগুলি বিচ্ছিন্ন নয়। বিজেপি সাংসদ ও নেতাদের বারবার করা মন্তব্যের পাশাপাশি এগুলি এসেছে, যাঁরা মোদীকে রাজার মতো এবং নাগরিকদের তাঁর প্রজার মতো বর্ণনা করেছেন — সমালোচকদের মতে এই ভাষা বিরোধী পক্ষ, বামপন্থী ও কংগ্রেস দলকে দুর্বল করার পাশাপাশি কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠার একটি বিজেপি-আরএসএস প্রকল্পের ইঙ্গিত দেয়। আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে মোদীর শাসনকালে ভারতে নাগরিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত হয়েছে, যা এই অভিযোগকে আরও জোরালো করে তোলে।
বিজেপি এই উদ্বেগগুলি খারিজ করে, বরং তার শাসনকালের সাফল্যের দিকে ইঙ্গিত করে এবং আগামী কয়েক দশক ধরে দেশে অপ্রতিদ্বন্দ্বী শাসনের ভবিষ্যদ্বাণী করে। কিন্তু বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাধীনতা নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মধ্যে, বিরোধীরা আশঙ্কা করছে যে ভারত ১৯৪৭ সালে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে অর্জিত স্বাধীনতা হারাতে বসেছে — এমন এক স্বাধীনতা, যা এক দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছিল, যে সংগ্রাম থেকে আরএসএস স্বেচ্ছায় দূরে থেকেছিল।
এখন প্রশ্ন এই যে, রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে “আজাদি”-র প্রতি বিজেপি-র অস্বস্তি দলটিকে ক্ষমতার আরও কেন্দ্রীকরণ ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে ঠেলে দেবে, নাকি দশকের পর দশক ধরে চলা ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত গণতান্ত্রিক চেতনা ভারত ধরে রাখতে পারবে।

