কেন চীন-ভারত সামরিক সংঘাতের উদ্দীপনার নয়, নিরসনের দরকার?

রাজনীতি

হিমালয় পর্বতের উপর এই সময়ে ঘটনার এক অদ্ভুত পালা চলছে। ১৫ ই জুন, সোমবার রাতে পূর্ব লাদাখের গলোয়ান উপত্যকায় ভারত ও চীন সেনার সংঘর্ষ কদর্য রূপ নিয়েছে। প্রকৃত নিয়ন্ত্রন রেখা (LAC) র কাছে চীন এর পিপলস্ লিবারেশন আর্মি (PLA) র সাথে সংঘর্ষের ফলে ২০ জন ভারতের সেনা নিহত হয়েছে। যেখানে নিহত ভারতের সেনাদের মধ্যে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে চীনের সেনার সাথে মুষ্ঠিযুদ্ধে, ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে চিকিৎসার বিলম্ব ও তীব্র শীতের কারণে।

এটি বিগত কয়েক দশকের মধ্যে প্রথম ভারত চীন দ্বন্দ্ব যেখানে অগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার না হওয়া সত্ত্বেও একসাথে এতজন সেনার মৃত্যু ঘটেছে। শেষবার যখন চীন এর সেনার হাতে ভারতের সেনাদের মৃত্যু ঘটেছিল সেটা ১৯৭৫। এর ফলে তুমুল উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে এবং দুই পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশী দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি ঘটিয়েছে।

ভারতীয় সেনাদের এই দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যু ভারতে রাজনৈতিক কোন্দলের সৃষ্টি করেছে এবং দক্ষিণপন্থী উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলোকে চীনের মানুষের প্রতি ভারতীয় জনমানসে অহেতুক আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টির সুযোগ করে দিয়েছে। এই অবস্থা ১৯৬২ সালের চীন ভারত যুদ্ধের সময়কার কথা মনে করাচ্ছে। এই সংকট পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য ভারত রাষ্ট্র দ্বিমুখী নীতির সাহায্য নিয়েছে। একদিকে প্রধান মন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী চীনকে প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়েছেন, অন্যদিকে দুই দেশের উচ্চ পদস্থ সেনারা  ব্যর্থ হবার পর ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়সংকর চীনের স্টেট কাউন্সিলর এবং বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই র সাথে টেলিফোনে আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা নিরসনের চেষ্টাতে সচেষ্ট হয়েছেন। তবুও ভারত সীমান্ত উত্তেজনা নিরসনের জন্য যথেষ্ট সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ থেকে এখনও অনেক দূরে।

বছরের পর বছর ধরে ভারতের মূল ধারার সংবাদ মাধ্যমগুলো যুদ্ধ নিয়ে উন্মাদনা ছড়ানো কে একটি উচ্চ মাত্রায় নিয়ে গেছে। যদি আমরা অতীত ও বর্তমান ভারতের মূল ধারার সংবাদ মাধ্যমগুলোর বক্তব্য ভালোভাবে বিশ্লেষণ করি তাহলে এই ভুল ধারনাটি যেতে বাধ্য যে ভারত তার প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে একটি চিরন্তন যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে এবং যদি নয়া দিল্লী তার ক্ষমতা প্রদর্শনে ব্যর্থ হয়, তাহলে “ভারতবর্ষের ধারনা” টি সংকটের মুখে পড়ে যাবে। যদি কেউ পিপলস ডেইলি থেকে শুরু করে গ্লোবাল টাইমস এর চীনা সম্পাদকীয়গুলির মধ্যে যায়, তবে তারা দেখতে পাবে যে কীভাবে বেইজিং সীমান্তে উদ্বেগকে  দূরে সরিয়ে রেখে শান্তির দিকে এবং শক্তিশালী কূটনৈতিক সম্পর্কের উপর চাপ দিচ্ছে। কেন ভারতীয় সংবাদমাধ্যম গুলি সমানভাবে দায়িত্বশীল এবং শান্তি-সমর্থিত দৃষ্টিভঙ্গি রাখতে পারে না এবং সরকারকে রক্তের জন্য উন্মাদনার পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ উপায়ে উত্তেজনা দূরীকরণের জন্য আহ্বান জানায় না? এর উত্তর রয়েছে এই দ্বন্দ্ব প্রসঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে দুই পক্ষের অবস্থান এর মধ্যে।

যে কোনও চিন-ভারতীয় সামরিক সংঘাত হওয়ার মূল বিষয়টি হ’ল “ম্যাকমাহন লাইন”, যা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা তাদের ভূখণ্ডের সীমান্ত হিসাবে আঁকেন। এমনকি প্রাক্তন চীনা সম্রাটরা “ম্যাকমোহন লাইন” কে সীমান্ত হিসাবে মেনে নিতে অস্বীকার করেছিলেন কারণ ব্রিটিশরা তাদেরকে ঔপনিবেশিক আধিপত্য ব্যবহার করে এটি মেনে নিতে বাধ্য করেছিল।

১৯৪৯ সালে মাও সে তুং এর নেতৃত্বে পিপলস রিপাবলিক অফ চাইনা (PRC) গঠিত হবার পর চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি ভারতে সেই সময় জওহরলাল নেহেরুর নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন কংগ্রেস এর সাথে সীমান্ত সমস্যা মেটাতে উদ্যোগী হয়। নিজেদের শাসনকাল কে ” ঔনিবেশিকতার বিরোধী” হিসাবে চিহ্নিত করে “ঔপনিবেশিকতা” নিয়ে কাগুজে বিরোধিতা করলেও নেহেরু ঔপনিবেশিক নীতি গুলোই বজায় রাখেন এবং ঔপনিবেশিক প্রভুদের দ্বারা নির্ধারিত সীমান্ত নিয়ে দৃঢ় থাকেন। ভারতীয় শাসক শ্রেণিরা তাদের ঝুঠা জাতীয়তাবাদকে তুষ্ট করে, ঔপনিবেশিক-যুগের নীতি এবং জনবসতিগুলিকে নির্লজজভাবে আবদ্ধ করে রাখে।

পরবর্তীতে, ১৯৫৩ সালে জোসেফ স্তালিন এর মৃত্যুর পর ষাটের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন এর নেতৃত্ব মার্কসবাদ কে বর্জন করে সংশোধনবাদী হয়ে উঠলে CPC এর সাথে তাদের আদর্শগত দ্বন্দ্ব তীব্রতর হয়। এর ভারত চীন সম্পর্কের সমীকরণে বহুলাংশে পরিবর্তন আসে। নেহেরু মস্কোর সাথে কাছাকাছি এসে নিকিতা ক্রুশ্চেভ এর সুরে নাচতে লাগলে সীমান্তে ভারত চীন সেনা সংঘাত ঘন ঘন ঘটতে থাকে। ভারতের আক্রমণাত্মক ভঙ্গিমা এবং “ফরোয়ার্ড টহল” নীতি, যা নেহরু আমেরিকান এবং সোভিয়েত প্রভাবের ফলে গ্রহণ করেছিলেন, তার প্রভাবে ১৯৬২ সালে ভারত চীন যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধে ভারত চূড়ান্ত ভাবে পরাজিত হয়।

যদিও চীন ১৯৬২ সালের পরেও সীমান্ত ইস্যুতে শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রস্তাব দেয়, মাও বেঁচে থাকার আগে পর্যন্ত ভারত সম্পর্ককে স্বাভাবিক করতে অস্বীকার করে। সিপিসির নেতৃত্বও হতাশাগ্রস্থ হয়েছিল এই প্রশ্নে যে ভারত অক্সাই চিন অঞ্চলটির মালিকানা দাবি করে, যেটা  চীন দাবি করে বরাবরই তার অঞ্চল ছিল। ১৯৭৬ সালে মাও-র মৃত্যুর পরে ভারতের প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী বেইজিংয়ের সাথে দহরম মহরম শুরু করেন।ততক্ষণে চীন তার সমাজতান্ত্রিক আদর্শকে বাতিল করে সিপিসির সুবিধাবাদী নেতৃত্বের অধীনে পুঁজিবাদকে গ্রহণ করেছিল।

সিপিসি তার রঙ পরিবর্তন করে চীনা রাষ্ট্রকে সামাজিক-ফ্যাসিবাদী রূপে রূপান্তরিত করা সত্ত্বেও, ভারতের সাথে সীমান্ত ইস্যুতে এটি অবিচল ছিল। বিগত ৫৮ বছরে সীমান্ত বিষয়ে কোনো গুণগত পরিবর্তন আসেনি। তবে সাম্প্রতিক চীন-ভারতীয় সামরিক দ্বন্দ্বের মূলে হল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে মোদির অ্যাডভেঞ্চারিস্ট প্রচেষ্টা। ট্রাম্প চীনবিরোধী কার্ড খেলে হোয়াইট হাউসে ফিরে আসতে উদ্যোগী। সিরিয়া, আফগানিস্তান ও ইরাকে পরাজিত হওয়ার পর আমেরিকা তার এজেন্ডা এগিয়ে নিতে নতুন এবং নিরাপদ যুদ্ধ থিয়েটার সন্ধান করতে আগ্রহী যেখানে এটি একটি বোরে কে ব্যবহার করতে পারে – এই ক্ষেত্রে ভারত।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম গুলি চীনের সাথে যুদ্ধের স্বপক্ষে বলছে কারণ এই মিডিয়া আউটলেটগুলির মালিক বড় মুৎসুদ্দি বুর্জোয়ারা। তারা প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের কালো বিপণনের মাধ্যমে যুদ্ধ সংঘটিত হলে প্রচুর লাভবান হবে,  অন্যদিকে লক্ষাধিক দরিদ্র মানুষ মারা যেতে পারে, বিশেষত ভারতীয় সেনারা যারা ক্ষমতাসীন শ্রেণীর কামানের গোলা তে পরিণত হয়েছে। এখনও, যখন মূলধারার প্রেসগুলি চীনা বিদ্বেষ এবং উগ্র জাতীয়তাবাদ ছড়াতে ব্যস্ত, মোদি সরকার ইতোমধ্যে ভারতের প্রাকৃতিক সম্পদ কাজে লাগাতে, অনিয়ন্ত্রিত খনির মাধ্যমে পরিবেশ ধ্বংস করতে এবং উপজাতি জনগণকে তাদের গ্রাম এবং জঙ্গলথেকে বিতাড়িত করার জন্য, দেশীয় মূলধনকে উপভোগ করতে ৪১ টি কয়লা ব্লক নিলাম করেছে । “জাতীয়তাবাদ” এর নামে আরও প্রাকৃতিক সম্পদকে বেসরকারীকরন করা হবে, যখন চীনা কর্পোরেশনরা ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের দ্বারা প্রদর্শিত মূর্খতায় বিদ্রূপ করবে।

ভারত চীন সংঘাত কে কেন্দ্র করে চীনা দ্রব্য বয়কট এর নাটকের মধ্যেও কিন্তু চীনে তৈরী সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল এর মূর্তিকে অক্ষত রাখা হয়েছে। মোদী জমানা এবং বিজেপি বিহার, তামিনাড়ু এবং পশ্চিমবঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের পূর্বে ভোটার দের মেরুকরণ ঘটাতে চায়। একইসঙ্গে একদিকে তারা ভারতের প্রাকৃতিক সম্পদ করপোরেশন গুলোকে প্রায় মুক্ত হস্তে লুঠ করার সুযোগ করে দিচ্ছে, অন্যদিকে এন আর সি র নামে লাখ লাখ গরীব মানুষের নাগরিকত্ব বাতিল করেছে, যারা অদূর ভবিষ্যতে এই কর্পোরেট দের দাসে পরিণত হবে।

ভারতীয় মূলধারার সংবাদমাধ্যমের এই নির্লজ্জ যুদ্ধ উন্মাদনা, এমনকি কংগ্রেস দলীয় নেতৃত্বের  চীনের সাথে যুদ্ধের জন্য বুক চাপড়ানো চীনের সাথে সামরিক দ্বন্দ্বের এক নতুন পরিস্থিতি তৈরী করতে পারে, যেটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগীদের নির্দেশে মোদি এগিয়ে যাবেন। এর আগে, কংগ্রেস পার্টি, তার কয়েক দশক দীর্ঘ শাসনকালে, “ফরওয়ার্ড টহল” অনুশীলনের একটি নতুন সংস্করণ গ্রহণ করেছিল, যা সীমান্ত অঞ্চলে চীন-ভারত বিরোধকে আরও তীব্র করে তুলেছে। এই ধরনের উন্মাদনা অঞ্চলটির শান্তি ও স্থিতিশীলতার উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে, এবং ভারতের অর্থনীতিতে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি ঘটাবে, যা এখন ই কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে।

চীন দেখিয়েছে যে সে অবশ্যই বিশ্বের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে তার নতুন শক্তিশালী অবস্থানের সাথে তার পক্ষে এই স্রোত ঘুরিয়ে দিতে পারে, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিমা পুঁজিবাদী ব্লক গুলির ২০০৮ থেকে চলা   সাবপ্রাইম সঙ্কটের কারণে তার শক্তি হারিয়ে দুর্বল হচ্ছে। কোভিড -১৯ মহামারীটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দুর্বলতা দেখিয়েছিল, এরসঙ্গে যা ট্রাম্প শাসনের শ্বেত-আধিপত্যবাদী নীতির বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের কারণেও সে আরো ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। চীনের সাথে সংঘাত এর প্রশ্নে ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি সাহায্য আশা করতে পারে না। এছাড়া বর্তমানে রুশ- চীন সুসম্পর্কের কারণে ভারত ১৯৬০ এর মত রাশিয়ার কাছ থেকেও সাহায্য পাবে না।

গালওয়ান উপত্যকায় চীন-ভারতীয় সামরিক সংঘাত  অব্যাহত রাখা ফেক নিউজ ছড়ানো,  চীন বিদ্বেষী জনমত তৈরি করা এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে যুদ্ধের অপটিক্স দিয়ে শিরোনাম করা ইত্যাদির ফলে শেষ পর্যন্ত ভারতের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ও ব্যবসায়িক স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। সেই সঙ্গে এটি ভারতের অর্থনীতিকে এখন যেখানে পৌঁছেছে তার চেয়ে আরও নীচে নামিয়ে  সঙ্কটের অতল গহ্বর এ পৌঁছে দেবে।কংগ্রেস পার্টির কথায় উত্যক্ত না হয়ে, শতবর্ষ পুরাতন সীমান্ত বিরোধের সমাধান না করা হলে ও  কমপক্ষে  পূর্ব লাদাখের উত্তেজনা নিরসনের জন্য মোদীর  সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।

এটি আরও ভাল বিকল্প হতে পারত, তবে বিষয়টি হ’ল মোদী বা ভারতের শাসকগোষ্ঠী উভয়ই শান্তি চান না, কারণ তাদের অন্য দায় রয়েছে। এই ধরনের অ্যাডভেঞ্চারিজম আমেরিকাকে উপকৃত করতে পারে, পশ্চিমে সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্সকে সমৃদ্ধ করতে পারে এবং মোদী বিজেপির কালো টাকার বিপণনকারীদের তাদের অর্থ ভান্ডার পূর্ণ করতে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু ভারতের আপামর সাধারণ মানুষকে সীমাহীন দুর্দশার মধ্যে ফেলবে।

মুল ইংরাজী থেকে অনুবাদ করেছেন অর্পণ কুণ্ডু

এই প্রবন্ধটি কি আপনার ভাল লেগেছে?

তাহলে মাত্র ১০০ টাকার থেকে শুরু করে আপনার সাধ্যমত আর্থিক সহায়তা করে আমাদের এই নির্ভীক ব্লগটি কে সহযোগিতা করুন

যেহেতু আমরা FCRA-তে পঞ্জীকৃত নই, অতএব ভারতের বাইরের থেকে সহযোগিতা আমাদের পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব নয়।

আপনার মতামত জানান