অবশেষে সব জল্পনার অবসান হল। প্রাক্তন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী ও আসানসোলের সাংসদ বাবুল সুপ্রিয় যোগ দিলেন তৃণমূল কংগ্রেসে। যে পিসি-ভাইপো জুটি কে পেটের তাগিদে এই কয়েকদিন আগে পর্যন্ত দৈনিক কয়েক ডজন বার গালাগালি করে এসেছেন, বর্তমানে সেই ভাইপো, অভিষেক ব্যানার্জির হাত ধরে তৃণমূল কংগ্রেসে আসলেন বাবুল। বাবুল সুপ্রিয়ের তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদান, তাঁর কর্মকান্ড দেখে রীতিমতো হতবাক তাঁর পুরানো পার্টি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। এই প্রথম মোদী সরকারের কোনো প্রাক্তন মন্ত্রী— প্রতিমন্ত্রী যদিও—বিজেপি ত্যাগ করে বিরোধী শিবিরে গেলেন। তাও আবার বাবুলের মতন কট্টর হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদী নেতা যিনি জোর গলায় বলতেন তিনি কোনদিনই তৃণমূল কংগ্রেস করবেন না। 

গত ৩১শে জুলাই ফেসবুকে পোস্ট করে বাবুল জানান দেন যে তিনি চিরকালের মতন রাজনীতি ছাড়ছেন। রাজনীতি থেকে বিদায় নেওয়ার সাথে সাথে আসানসোলের সাংসদ পদ ত্যাগ করার কথাও জানান। তবুও, তাঁকে নাকি পরবর্তীকালে বিজেপি সভাপতি জেপি নাড্ডা আর কেন্দ্রীয় গৃহমন্ত্রী অমিত শাহ সাংসদ হিসেবে রেখে দেন। সেই সময়ে ফেসবুকে বাবুল লিখেছিলেন যে তিনি বিজেপি ছাড়া আর কোনো দল কোনো দিন করবেন না। জানিয়ে ছিলেন তিনি চিরকাল মোদী ও শাহের কাছে কৃতজ্ঞ থাকবেন। ফলে তাঁকে নিয়ে শুধু একপ্রকার নিশ্চিন্তে ছিল বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব। দিলীপ ঘোষের সাথে তাঁর চরম বিবাদ হলেও, ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে, বন্দোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বিজেপির অবাঙালি প্রার্থী, বাবুলের চামচা প্রিয়াঙ্কা তিব্রেওয়ালের সমর্থনে প্রচারের তালিকায় বাবুলের নামও লেখা হয়। যদিও তিনি জানিয়ে দেন তিনি যাবেন না, তবুও তাঁকে দল ত্যাগ করতে দেখবেন এই কথা ঘোষ ছাড়া কেউই ভাবেননি। 

https://www.facebook.com/BabulSupriyoOfficial/posts/4345115045531270

বন্দোপাধ্যায়ের হাত ধরেই বাবুল জানান দিলেন যে তিনি পশ্চিমবঙ্গের মানুষের জন্যে কিছু করতে ভীষণই আগ্রহী। তাই তিনি নাকি ৫০ দিনের ব্যবধানের পরে রাজনীতিতে ফিরলেন। আরও মজার ব্যাপার হল এইবার তিনি কামানের নিশানায় ফেললেন মোদী সরকার কে আর জানান দিলেন যে বিজেপিতে তিনি নাকি যোগ্য সম্মান পাচ্ছিলেন না। বহুদিন পরে পদ্ম পুকুর থেকে একটি মাঝারি সাইজের মাছ কে বড়শিতে বিঁধে যারপনাই খুশির আবহাওয়া জোড়া ফুল শিবিরে। সবাই, এমন কী বাবুলের বিরুদ্ধে মহিলাদের প্রতি অসম্মানজনক মন্তব্য করার অভিযোগকারিণী তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ মহুয়া মৈত্রও, তাঁকে দলে স্বাগত জানিয়েছেন। 

যথারীতি ঘোষের মতন বিজেপি নেতারা তাঁকে মন্ত্রিত্ব লোভী বলে, বিশ্বাসঘাতক বলে দেগে দিয়েছেন। জুন মাসে যখন মুকুল রায় দলত্যাগ করে তৃণমূল কংগ্রেসে ফিরে যান সেই সময়েও বাবুল সবচেয়ে বেশি সোচ্চার হয়েছিলেন ও বলেছিলেন দল তিনি ছাড়বেন না। সেই সব পুরানো কাসুন্দি ঘেঁটে বিজেপি এখন বাবুলের প্রস্থানের নৈতিক বিরোধিতা করছে। আশ্চর্যজনক ভাবে এই সব কথা সেই দলের থেকে আসছে যাঁরা পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আগে তৃণমূল কংগ্রেস ভাঙিয়ে অসংখ্য ছোট-বড়-মাঝারি নেতাদের নিজেদের দলে নিয়ে আসে। এমন কী বাবুলের চরম আপত্তি থাকা সত্ত্বেও আসানসোলের প্রাক্তন মেয়র জিতেন্দ্র তিওয়ারি কে বিজেপিতে নিয়ে আসে। নির্বাচনে ভরাডুবি হওয়ার পর থেকেই সেই সব প্রাক্তন তৃণমূল কংগ্রেস নেতারা মাতৃসম মমতার আঁচলের তলায় স্থান পেতে কাতর হয়ে উঠেছেন। 

এহেন বাবুলের ডিগবাজি কোনো ভাবেই রাজনৈতিক ভাবে সচেতন মানুষ কে অবাক করবে না। যদিও বাবুল জানিয়েছেন যে সব কিছুই গত তিন-চার দিনে হয়েছে, আসলে রাজনীতি থেকে “অবসর” গ্রহণের কথা বলেই তিনি সিগন্যাল দেন যে বিজেপিতে তিনি ভবিষ্যত দেখতে পারছেন না। তার কারণ তাঁকে জুলাই মাসেই মন্ত্রীসভার থেকে বরখাস্ত করেন মোদী। বরখাস্ত করার কারণ ছিল তিনি বিধানসভা নির্বাচনে নিজে তো টালিগঞ্জ আসন থেকে হেরে গেলেনই তার সাথে আবার আসানসোল লোকসভা কেন্দ্রের অধীনে একটি বিধানসভা কেন্দ্র ছাড়া বাকি কোথাও তিনি বিজেপি কে জেতাতে পারলেন না। তাই কোপ পড়েছিল তাঁর গদির উপর। এখন যদি তাঁকে মমতা বন্দোপাধ্যায় রাজ্যের মন্ত্রী করেন তাহলে তাঁর শখ পূর্ণ হয়।

দল বদল করা দক্ষিণপন্থী শিবিরে, এমন কী সংসদীয় বাম শিবিরেও কোনো নতুন ব্যাপার নয়। এককালে কংগ্রেস থেকে তৃণমূল কংগ্রেসে আর তৃণমূল কংগ্রেস থেকে কংগ্রেসে যাতায়াত একটি জলভাত ব্যাপার ছিল। রেজিমেন্টেড ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) [সিপিআই (এম)] সেই সময়ে এই সংস্কৃতির থেকে মুক্ত থাকলেও বর্তমানে সেই দল থেকেও প্রচুর নেতা কর্মী বিজেপিতে যোগদান করেছেন। কিন্তু সমস্যার ব্যাপার হল বাবুল সুপ্রিয়-র অতীত। যে অতীতে রক্তের দাগ আছে, ঘৃণা ছড়াবার আর দাঙ্গায় উস্কানি দেওয়ার ঘটনা আছে। তৃণমূল কংগ্রেস কি পারবে ওয়াশিং মেশিন হিসাবে পারবে সাম্প্রদায়িক, দাঙ্গাবাজ বাবুল কে ধুয়ে সাফ করে নিতে? বাবুল সুপ্রিয়ের তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদান কি তাঁর সাত খুন মাফ করবে?

২০১৮ সালের মার্চ মাসে আসানসোলের মাটিতে ইদানিং কালের সব চেয়ে বড় সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা ঘটে। পরিকল্পিত ভাবে একটি মুসলিম-বিরোধী সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ সংগঠিত করা হয় বিজেপির পিতৃপ্রতিম সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) তরফ থেকে। সেই দাঙ্গার মূল কুচক্রীদের একজন ছিলেন বাবুল। আর বাবুলের সেই ঘৃণ্য ভূমিকার জন্যে সেইদিন খুন হন ১৬ বছরের কিশোর মোহাম্মদ সিবাতুল্লাহ। সেই কিশোরের পিতা, আসানসোলের রেলপাড়ের নূরানী মসজিদের ইমাম, মওলানা ইমদাদুল্লাহ রাশিদী ঘোষণা করেন যে কোনো মুসলিম যদি তাঁর ছেলের হত্যার বদলা নিতে হিংসায় জড়ান তাহলে তিনি শহর ছেড়ে চলে যাবেন। যখন রাশিদী এই কথা বলে শান্তির আর সম্প্রীতির বাণী শোনাচ্ছেন, সেই সময়ে আসানসোলের বহিরাগত সাংসদ নানা অঞ্চলে মুসলিম বিরোধী হিংসায় প্ররোচনা দিতে থাকেন।  

এই সাম্প্রদায়িক হিংসার মাধ্যমে আসানসোলের অবাঙালি হিন্দুদের মধ্যে ও বাঙালি হিন্দু ও দলিতদের একটা অংশের কাছেও বাবুল সুপ্রিয় অত্যধিক জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ফলে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচন জেতা তাঁর কাছে একটা দুধভাত ব্যাপার হয়ে যায়। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তিনি তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রীর বাইরের থেকে পাঠানো প্রার্থী দোলা সেন কে ৭০,০০০ ভোটে হারান, ২০১৯ সালে বন্দোপাধ্যায়ের প্রার্থী মুনমুন সেন কে তিনি সেই জায়গায় দুই লক্ষ ভোটের ব্যবধানে হারান। কী কারণে দুই বার বাবুলের বিরুদ্ধে মমতা বন্দোপাধ্যায় অদ্ভুত, দুর্বল, মানসিক ভাবে ভারসাম্যহীন ও স্থানীয় মানুষ এবং সংগঠনের সাথে অপরিচিত প্রার্থী কে আসানসোলের মতন একটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে টিকিট দিলেন তা সবার অজানা হলেও এর পিছনে যে ঝালমুড়ি ডিপ্লোম্যাসি বা মোদী আর বন্দোপাধ্যায়ের গোপন আঁতাত কাজ করছিল না সেই কথা কেউই হলফ করে বলতে পারবেন না। বাবুল সুপ্রিয়ের তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদান করার পিছনে কি ঝালমুড়ির কোনো ভূমিকা নেই?

বাবুল সুপ্রিয় গত বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্য জুড়ে তৃণমূল কংগ্রেস ও মমতা বন্দোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেন। তিনি চরম ইসলাম-বিদ্বেষী মন্তব্য করে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ করেন। মুসলিম ভোটারদের গালাগাল করেন। আর রাজ্যের মুসলিম সম্প্রদায়, ধর্মনিরপেক্ষ হিন্দুরা, আদিবাসী আর দলিতদের একটা বড় অংশ কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস কে হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এক শক্তি ভেবে ভোট দিয়েছিলেন। ভোটারদের আশা ছিল মোদী সরকারের সর্বনাশা নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে, সাম্প্রদায়িক বিভাজনমূলক রাজনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে, তৃণমূল কংগ্রেস এই রাজ্য কে রক্ষা করবে। অথচ সেই তৃণমূল কংগ্রেস যখন আজ বিজেপির থেকে পাইকারি হারে দাঙ্গাবাজদের নিজের দলে নিচ্ছে, মোদী সরকারের নীতিগুলো কে রাজ্যে প্রয়োগ করছে, জনতার আন্দোলন দমন করছে ও গরিব মানুষের স্বার্থ বিরোধী নয়া-উদারনৈতিক অর্থনৈতিক মডেল অনুসরণ করে জনগণের সর্বনাশ করছে তখন মানুষের কী উপলব্ধি হচ্ছে? 

বাবুল সুপ্রিয়ের তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদান ও অন্যান্য হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদী নেতাদের বিজেপি থেকে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদান করা কোনো আশ্চর্যজনক ব্যাপার নয়। তার কারণ আরএসএস বুঝেছে পশ্চিমবঙ্গে তার কর্পোরেট-সামন্ততান্ত্রিক জোটের একনায়কত্বের প্রকল্প, যার নাম “হিন্দু রাষ্ট্র” প্রকল্প, একমাত্র মমতা বন্দোপাধ্যায় সবচেয়ে ভাল করে প্রয়োগ করতে পারেন। তাই বিরোধী বিজেপি ও শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের উপর একই সাথে প্রভাব বিস্তার করে নিজের প্রতিপত্তি কে বিস্তারিত করছে আরএসএস। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির শিবিরে প্রদীপ টিমটিম করে জ্বললেও আরএসএস এর কোনো ক্ষতি হবে না কারণ বন্দোপাধ্যায়ের সরকারের মাধ্যমে হিন্দুত্ব ফ্যাসিবাদের রথ এগিয়ে যাবে পশ্চিমবঙ্গে। গরিব শ্রমিক, কৃষক, মেহনতী মানুষ কে ক্রীতদাসে পরিণত করার হিন্দু রাষ্ট্রের প্রকল্পের বিরুদ্ধে যতদিন না তৃণমূল স্তর থেকেই গণপ্রতিরোধ সংগঠিত করা হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত এই অবস্থার কোনো পরিবর্তন হবে না।

এই প্রবন্ধটি কি আপনার ভাল লেগেছে?

তাহলে মাত্র ৫০০ ভারতীয় টাকার থেকে শুরু করে আপনার সাধ্য মতন এই ব্লগটি কে সহযোগিতা করুন

যেহেতু আমরা FCRA-তে পঞ্জীকৃত নই, অতএব ভারতের বাইরের থেকে সহযোগিতা আমাদের পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব নয়।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

CAPTCHA


পিপলস রিভিউ বাংলা