সিএএ ২০১৯ আর এনআরসি নিয়ে আন্দোলনকারীদের কৃষক আন্দোলনের বিজয়ের থেকে কী শেখা দরকার?

রাজনীতি

ভারতের সংসদে যে ভাবে তড়িঘড়ি শাসক ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) কৃষি আইন বাতিল করলো, এ ছাড়াও কৃষকদের বকেয়া সমস্ত দাবি মেনে নেওয়ার লিখিত প্রতিশ্রুতি দিল, তা দেখে অনেকেরই, বিশেষ করে ইসলামী পরিচয়-ভিত্তিক রাজনীতির লোকেদের মনে আশা জেগেছে যে হয়তো এই ভাবেই বিতর্কিত নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন, ২০১৯ (সিএএ ২০১৯), আর জাতীয় নাগরিক পঞ্জী (এনআরসি) বাতিল করা সম্ভব। আর এই ব্যাপারে ইন্ধন যোগাচ্ছে এক দল স্বার্থান্বেষী, মূলস্রোতের তথাকথিত বিরোধীরা। কিন্তু সত্যিই কি সিএএ ২০১৯ আর এনআরসি বাতিল করলে জনগণের ঘাড়ের থেকে, বিশেষ করে মুসলিমদের ঘাড়ের উপর থেকে, বিপদের খাঁড়া উঠে যাবে? 

সিএএ ২০১৯ আর এনআরসি নিয়ে দেশব্যাপী যে আন্দোলন ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে দানা বাঁধতে থাকে তার সাথে ২০২০ সালের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হওয়া প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর তিনটি বিতর্কিত কৃষি আইনের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা কৃষক আন্দোলনের অনেক পার্থক্য আছে। সব পার্থক্যের মধ্যে মূল হল এই দুই আন্দোলনের উপর বিজেপির রাজনৈতিক প্রভাবের পার্থক্য। 

সিএএ ২০১৯ আর এনআরসি বিরোধী আন্দোলনের উপর খুব সহজেই বিজেপি অপ্রত্যক্ষ ভাবে নেতৃত্ব কব্জা করতে পেরেছিল ও সামগ্রিক ভাবে এই জন জাগরণ কে নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে, ধর্মীয় মেরুকরণের স্বার্থে ব্যবহার করতে পেরেছিল।

তবে কৃষক আন্দোলনের ক্ষেত্রে কিন্তু সেই ব্যাপারটা হয়নি। অনেক চেষ্টা করেও কৃষক আন্দোলন কে অপহরণ করতে পারেনি, তার নেতৃত্বও দখল করতে পারেনি বিজেপি। বরং বিজেপিরই ঘর ভেঙেছে এই কৃষক আন্দোলন। পাঞ্জাবে আকালি দল, হরিয়ানায় আর পশ্চিম উত্তর প্রদেশে জাট সম্প্রদায় বিজেপির সাথ ছেড়েছে। অনেক বিজেপি নেতা কৃষকদের চাপে দল ছেড়েছেন। রাকেশ আর নরেশ টিকায়েতের মতন একদা হিন্দুত্ব ফ্যাসিবাদের সামন্তবাদী সাথীরা বিজেপির কট্টর শত্রুতে পরিণত হয়েছে। 

এই ঘর ভাঙার ফলে, দীর্ঘদিন ধরে বিজেপির পিতৃ সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) সযত্নে করা ধর্মীয় মেরুকরণের সমীকরণ বিগড়ে যাওয়ায়, বিজেপি কে বাধ্য হয়ে এক পা পিছনে যেতে হয়েছে। কিন্তু নাগরিকত্বের বিষয়ে বিজেপি আর মোদী সরকার বেড়ে খেলছে কারণ সিএএ ২০১৯ আর এনআরসি বিরোধী আন্দোলন কে একটি মুসলিম আন্দোলনে পরিণত করে দেওয়ায় গেরুয়া শিবিরের পক্ষে তা দেখিয়ে সংখ্যাগুরু হিন্দুদের—বিশেষ করে দলিতদের—মেরুকরণের মাধ্যমে নিজেদের নেতৃত্বে নিয়ে আসা সহজ হয়ে গেছে। এর প্রমাণ ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে উত্তর পূর্ব দিল্লীতে সংগঠিত মুসলিম-নিধন যজ্ঞ।

কৃষি আইনের ক্ষেত্রে কৃষকেরা আর বিরোধীরা কিন্তু আইনের সঠিক ব্যাখ্যার মারফৎ তার বিরোধিতা করেছেন। তাঁরা যেমন তিনটি কৃষি আইন বাতিল করার দাবি তুলেছিলেন, সাথে কিন্তু ন্যুনতম সহায়ক মূল্যে (এমএসপি) সরকার যেন ফসল কেনা বাধ্যতামূলক করে, সেই সংক্রান্ত একটি নতুন আইন পাশ করার দাবিও তাঁরা তুলেছেন। 

এর কারণ কৃষকেরা জানেন যে আইনগুলো আগে ছিল না। আবার জানুয়ারি মাসে মোদী সরকার আইনগুলো দেড় বছরের জন্যে স্থগিতও করে দিয়েছিল। কিন্তু সেই আইন আসার অনেক আগের থেকেই কৃষকেরা, বিশেষ করে প্রান্তিক, গরিব ও মধ্য কৃষকেরা, ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়ার কারণে তীব্র অর্থনৈতিক সঙ্কটে ভুগছেন। ফলে শুধু আইন বাতিল করলে ভবিষ্যতের সঙ্কটের থেকে বাঁচা গেলেও বর্তমান অর্থনৈতিক সঙ্কট থেকে বাঁচা সম্ভব নয়।

তাই কৃষকেরা সমস্ত ফসলের উপর, স্বামীনাথন কমিশনের সি-২ হারে, উৎপাদন খরচের দেড় গুণ হারে এমএসপির আইনী গ্যারান্টি চেয়েছেন যাতে তাঁরা ফসল উৎপাদন করার আগেই জেনে যান তাঁদের উপার্জন কী হতে পারে। আর সরকারি দরে কেনা বেচা করলে তাঁদের কে ফোঁড়েরা শোষণ করতেও পারবে না।

ফলে যখন মোদী সরকার লিখিত ভাবে কৃষকদের জানালো যে পাঁচ-সদস্যের যে কমিটি কৃষকেরা গড়েছেন এমএসপি নিয়ে আলোচনা করতে, তার সাথে আলোচনা করে এমএসপি সংক্রান্ত আইনের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাবে সরকার, তখনই কৃষকেরা নিজেদের ৩৭৮ দিন-ব্যাপী দিল্লীর সীমান্তে চলমান বিক্ষোভ আন্দোলন স্থগিত রাখার কথা ঘোষণা করলেন।

অথচ নাগরিকত্ব আন্দোলনের যে ধারার জন্ম হয়েছিল ডিসেম্বর ২০১৯ এ, দিল্লী, মুম্বাই, কলকাতা, প্রভৃতি শহরে, তা মূলত একটি ভ্রান্ত ধারনার ভিত্তিতে হয়েছিল। বিজেপি সিএএ ২০১৯ সংসদে পাশ করার আগের থেকে এনআরসি কে মুসলিম-বিরোধী একটি অভিযান হিসাবে চিত্রিত করে একদিকে যেমন মুসলিমদের ভয় দেখায়, তেমনি অন্যদিকে হিন্দুদের তাঁতিয়ে তোলে।

অসম, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, প্রভৃতি রাজ্যে বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তুদের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় বিজেপি সিএএ ২০১৯ কে খুড়োর কলের মতন ঝুলিয়ে। অনেক হিন্দুদের, বিশেষ করে বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তুদের, বোঝানো হয় যে এনআরসিতে তাঁদের নাম কাটা গেলেও সিএএ ২০১৯ ব্যবহার করে তাঁরা নাগরিকত্ব ফিরে পাবেন। 

এই মিথ্যার টোপ শুধুই বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তুরা গেলেনি, বরং তথাকথিত বিজেপি-বিরোধী ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলো, নানা রঙের বামপন্থী আর পরিচয় রাজনীতির ধারক বাহকেরাও গিলেছিলেন। তার ফলেই সিএএ ২০১৯ আর এনআরসি বিরোধী আন্দোলন মূলত মুসলিম বাঁচাও আর সংবিধান বাঁচাও আন্দোলনে বদলে দেওয়া হয়।

তথাকথিত সমস্ত ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি, সিএএ ২০১৯ আর এনআরসি কে বিজেপির ছক অনুসারে মুসলিম-বিরোধী আখ্যা দিয়ে, শুধুই মুসলিমদের এনআরসি প্রতিরোধ করার ডাক দিল। মুসলিম অঞ্চলে গড়ে ওঠা আন্দোলনগুলোর উপর ভিত্তি করে নিজেদের রাজনৈতিক মুনাফা অর্জন করতে থাকল। এই তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলোর মধ্যে কেউই হিন্দুদের মধ্যে, দলিত আর আদিবাসীদের মধ্যে এনআরসি-বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলেনি। এনআরসির প্রথম ধাপ যে জাতীয় জনসংখ্যা পঞ্জি (এনপিআর) তার বিরুদ্ধেও জনমত গড়ে তোলেনি। 

সামগ্রিক ভাবে, সিএএ ২০১৯ আর এনআরসি কে এক সাথে জুড়ে দিয়ে, মুসলিমদের বোঝানো হয় যে বিজেপি নাকি শুধুই তাঁদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেবে। একমাত্র তাঁরাই বিপদে পড়বেন এনআরসি হলে। হিন্দুরা নাকি এনআরসিতে বাদ পড়লেও সিএএ ২০১৯ এর কারণে নাগরিকত্ব ফিরে পাবে, মুসলিমেরা নাকি পাবেন না।  

ফলে, আতঙ্কিত মুসলিমেরা যেমন একদিকে নিজেদের নাগরিকত্ব বাঁচাতে পথে নামেন, অন্য দিকে হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যরা, বিশেষ করে দলিত ও পিছিয়ে পড়া শ্রেণীর জনগণ, মনে করেন যে বিজেপি তাঁদের বাঁচাতে সিএএ ২০১৯ যেহেতু এনেছে তাই এনআরসি হলেও তাঁরা নিরাপদে থাকবেন। কিন্তু ঘটনাটা কি তাই?

এনআরসি আর সিএএ ২০১৯ এর মধ্যে সম্পর্ক কী?

সিএএ ২০১৯ আর এনআরসি কে একে অপরের পরিপূরক হিসাবে দেখানো হলেও দুইটির মধ্যে কোনো সম্পর্কই নেই। এনআরসি-র উৎস হল নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন, ২০০৩ (সিএএ ২০০৩)। এই সিএএ ২০০৩ ভারতের নাগরিকত্ব আইনে “বেআইনী অভিবাসী” পরিভাষাটি যোগ করে। আর এই “বেআইনী অভিবাসী” খোঁজার জন্যেই চালানো হবে এনআরসি প্রক্রিয়া।  

যদি কোনোদিন মুসলিম সংগঠনগুলোর আন্দোলনের চাপে সিএএ ২০১৯ বাতিলও করে দেওয়া হয়, তবুও এনআরসি হবে, কারণ সিএএ ২০০৩ বর্তমানে প্রয়োগে রয়েছে। যে সিএএ ২০১৯ নিয়ে এত হৈচৈ, সেই আইন কারুরই নাগরিকত্ব কাড়ছে না। সেই আইনের মাধ্যমে এনআরসিতে বাদ যাওয়া কেউই নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়ার আবেদন করতে পারবেন না, সে তিনি যে ধর্মেরই হন না কেন।

আবার এই আইন পাশ হওয়ার আগে যখন তা নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল (সিএবি) ২০১৬ হিসাবে সংসদের যৌথ কমিটির (জেপিসি) কাছে যায় পর্যবেক্ষণের জন্যে, তখন সেই জেপিসির কাছে কেন্দ্রীয় গৃহ মন্ত্রকের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে এই আইনের আওতায় মোট ৩১,৩১৩ জন আবেদন করতে পারবেন, যাঁদের ইতিপূর্বে বিদেশী আইন, ১৯৪৮ আর পাসপোর্ট (ভারতে প্রবেশ) আইন, ১৯২০-র নিয়মাবলীর ২০১৫ আর ২০১৬ সালের সংশোধনীতে ছাড় দেওয়া হয়েছে।  

এই ৩১,৩১৩ জন বাদে আর কেউই নাগরিকত্বের জন্যে আবেদন করতে পারবেন না, বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে ছিন্নমূল হয়ে, দেশ ভাগের শিকার হয়ে, বর্তমান ভারতবর্ষে এসে উদ্বাস্তু হিসাবে জীবন কাটানো কোটি কোটি মানুষ, যাঁদের বহুসংখ্যকই দলিত, নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের।

সিএএ ২০১৯ অনুসারে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে ২০১৪ সালের ৩১শে ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারতে আগত হিন্দু, শিখ, জৈন, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও পার্সি সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যাঁদের ভারতের বিদেশী নিয়মাবলীর, ১৯৪৮, আর পাসপোর্ট (ভারতে প্রবেশ) নিয়মাবলীর, ১৯৫০, ২০১৫ আর ২০১৬ সালের সংশোধনী গুলোয় ছাড় দেওয়া হয়েছে—কেন্দ্রীয় গৃহ মন্ত্রকের প্রতিনিধির বক্তব্য হিসাবে যাঁরা ভারতে এসে নিজ দেশে ধর্মীয় নিপীড়নের প্রমাণ দিয়ে, অর্থাৎ সেই ঘটনার প্রকাশিত মিডিয়া ক্লিপিংস দিয়ে, আঞ্চলিক বিদেশী পঞ্জিকরণ দফতরে (এফআরআরও) নিজেদের নথিভুক্ত করে দীর্ঘ মেয়াদী ভিসা (এলটিভি) নিয়ে ভারতে বসবাস করছেন—এক মাত্র ভারতের নাগরিকত্বের জন্যে আবেদন করতে পারেন।

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, কাঁটাতার পেরিয়ে ভারতে চলে আসা কোটি কোটি বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তুরা কিন্তু এফআরআরও কী বস্তু তা জানেন না। তাঁদের অধিকাংশই এফআরআরও চোখে দেখেননি, সেখানে গিয়ে এলটিভি নেওয়া তো দূরের ব্যাপার। তাঁদের কারুর কাছেই, বিশেষ করে যাঁরা গত শতকের পাঁচের, ছয়ের বা সাতের দশকের শুরুতে ভারতে এসেছিলেন, বর্তমানে তৎকালীন সময়ের পূর্ব পাকিস্তানের বা পরবর্তী কালে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব সংক্রান্ত কোনো প্রমাণ পত্র নেই।

এই উদ্বাস্তুরা যে ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে ভারতে এসেছিলেন, তার তথ্য বহুল প্রমাণও তাঁদের কাছে, বর্তমান প্রজন্মের কাছে, আর নেই। আর যেহেতু তাঁরা কেউই এফআরআরওতে গিয়ে বা স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে গিয়ে নাগরিকত্বের আবেদন সেই সময়ে করেননি তাই তাঁরা কেউই ভারতের নাগরিক হিসাবে এনআরসিতে গণ্য হবেন না, আর সিএএ ২০১৯ এর মাধ্যমে নাগরিকত্বও পাবেন না।

গৃহ মন্ত্রকের প্রতিনিধি জেপিসিকে আরও জানিয়েছিলেন যে নাগরিকত্বের যে কোনো আবেদনের আগে এই ধর্মীয় নিপীড়নের অভিযোগ নিজের স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর অনুসারে, কেন্দ্রীয় গৃহ মন্ত্রক ভারতের বহিঃগোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (র) কে দিয়ে যাচাই করবে। তারপরে, র এর অনুমোদন পেলে গৃহমন্ত্রক এহেন উদ্বাস্তুদের ভারতে বাস করার জন্যে এলটিভি দেবে।

আর সিএএ ২০১৯ অনুসারে নাগরিকত্ব পেতে গেলে আবেদনকারীদের অবশ্যই ভারতের অভ্যন্তরীণ সুরক্ষায় নিয়োজিত স্থানীয় পুলিশ ও ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর (আইবি) ছাড়পত্র পেতে হবে যে ভারতে থাকাকালীন তাঁদের নাম কোনো বেআইনী কার্যকলাপে জড়ায়নি। 

যদি কোটি কোটি বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তুদের র আর আইবির ছাড়পত্র পেতে লাইনে দাঁড়াতে হয়, তাহলে ঠিক কত বছরে ভারতের নাগরিকত্ব তাঁরা পাবেন? ততদিন তাঁদের স্থান হবে ডিটেনশন কেন্দ্র হবে বা তাঁদের নাগরিকত্বহীন হয়ে বাঁচতে হবে। তাহলে কী ভাবে এই আইনে সাধারণ উদ্বাস্তুদের মঙ্গল হল?

সিএএ ২০১৯ আর এনআরসি নিয়ে মিথ্যার শাক দিয়ে মাছ ঢাকার অপচেষ্টা

২০০৩ সালের ডিসেম্বর মাসে, বিজেপির অটল বিহারি বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট (এনডিএ) সরকার সিএএ ২০০৩ সংসদে পেশ করে। এই আইন নিয়ে আলোচনার পরে, এনআরসি-র বিষয়ে অবগত হওয়ার পরেই, এই আইন সংসদের দুই কক্ষে পাশ হয় আর তার পরে, ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে, যখন পালাবদলের ফলে বাজপেয়ীর আর এনডিএ-র পতন হয়েছে ও কংগ্রেস পার্টির মনমোহন সিংহের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ প্রগতিশীল জোট (ইউপিএ) সরকার গঠন হয়েছে, সিএএ ২০০৩ আইন হিসাবে বিধিবদ্ধ হয়।

২০০৫ সাল থেকেই নানা রাজ্যে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে, বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া অঞ্চলগুলোয় “বেআইনী অভিবাসী” খোঁজার নাম করে পুলিশ ব্যাপক ধরপাকড় চালায় আর মতুয়া, নমো, প্রভৃতি দলিত জনগণ দমন পীড়নের শিকার হন। কিন্তু সেই সময়ে কোনো দলই এই উদ্বাস্তুদের স্বার্থে কোনো কথা বলেনি।

এনডিএ যখন সিএএ ২০০৩ পাশ করে তখন বিজেপির জোট সঙ্গী ছিলেন মমতা বন্দোপাধ্যায়। তিনি এই আইন নিয়ে চুপ থাকেন, বরং “বেআইনী অভিবাসী” তাড়াতে ইউপিএ সরকার কে চাপ দিতে সংসদের ভিতরে তুলকালাম ঘটান তিনি ২০০৫ সালে। রাজ্যসভার যে ১০৭তম কমিটি এই সিএএ ২০০৩ কে অনুমোদন দেয়, তার মাথায় ছিলেন প্রাক্তন কংগ্রেস নেতা ও প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী। সেই কমিটিতে বাম, ডান, মধ্যম, সবারই প্রতিনিধি ছিল এবং সেই কমিটি আলোচনা করেই ১৪(এ) ধারা, যা এনআরসি করার কথা বলেছে, অনুমোদন করে। 

রাজ্যসভার এই কমিটির রিপোর্টের ছয় নম্বর পয়েন্টে ব্যাখ্যা করা আছে যে ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে ভারতে আগত উদ্বাস্তুদের তাঁদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্যে কেন্দ্রীয় সরকার সেই দেশের সরকারের সাথে আলোচনা করবে, যাতে তাঁরা নির্বিঘ্নে নিজের দেশে বাস করতে পারেন। এই উদ্বাস্তুদের যে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে না আর তাঁদের যে এনআরসি করে বেনাগরিক করা হবে তা এই কমিটির রিপোর্টেই স্পষ্ট করা হয়েছিল।

তাই বন্দোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস-সমর্থিত বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার যে ভয়ানক আইন ডিসেম্বর ২০০৩ এ পাশ করে, বামপন্থীদের সমর্থনে চলা কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার সেই আইন কে বিধিবদ্ধ করে। আর তৎকালীন সময়ে পশ্চিমবঙ্গ আর ত্রিপুরার মতন বিরাট সংখ্যক বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তু বসবাসকারীদের রাজ্যের ক্ষমতায় আসীন বামপন্থীরাও এই নিয়ে আন্দোলন তো দূর, টু শব্দটিও করেননি।

ফলে, সমস্ত সংসদীয় দলের যৌথ ষড়যন্ত্রের ফসল, কর্পোরেটদের সস্তার বেনাগরিক দাস-শ্রমিক জোগানোর এই আইন, সিএএ ২০০৩ নিয়ে কোনো দল কোনো কথা না বলে শুধুই সিএএ ২০১৯ আর এনআরসি কে এক করে দেখিয়ে বর্তমানে বাজার গরম করে চলেছে। এর কারণ তাঁরা আপামর বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তুদের জানতে দিতে চায় না যে তাঁরা বিপদে পড়েছেন আর সিএএ ২০১৯ তাঁদের কোনো ভাবেই রক্ষা করবে না। তাই তাঁরা মুসলিম-মুসলিম করে সুর চড়িয়ে বিজেপির সুবিধা করে দিয়েছে, আর দলিত, নমঃশুদ্র উদ্বাস্তুদের এক মিথ্যা নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছে।

এই দলগুলোও চায় যাতে এনআরসি দিয়ে কোটি কোটি নাগরিকত্বহীন এমন দাস শ্রমিক বানানো যায় যাঁরা নিজেদের শ্রমের দাম নিয়ে কোনো দরদাম করতে পারবে না ও সস্তায় কাজ করতে রাজি হবে। এর ফলে যাঁদের নাগরিকত্ব বজায় থাকবে, তাঁদেরও শ্রমের দাম পড়ে যাবে ও তার ফলে নাগরিক আর বেনাগরিক শ্রমিকের মধ্যে এক তীব্র দ্বন্দ্ব দেখা দেবে। এতে বড় বড় কর্পোরেটদের চরম মুনাফা কামানোর পথ প্রশস্ত যেমন হবে তেমনি সেই মুনাফার থেকে নিজেদের ভাঁড়ারে ভাল রকমের কাট মানি এই দলগুলোর জুটবে।

যেহেতু তাঁরা সকলেই এই পুঁতিগন্ধময় পাঁকে একসাথে ডুব মেরেছেন, তাই সংসদীয় দলের নেতারা সিএএ ২০০৩ নিয়ে সত্য না বলে শুধু সিএএ ২০১৯ আর এনআরসি নিয়ে কথা বলে, মিথ্যা আর ছলনা দিয়ে, শাঁক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা চালিয়ে যাবেন।

কৃষক আন্দোলনের বিজয়ের থেকে কী শেখা প্রয়োজন?

আজ নাগরিকত্ব আন্দোলনের শরিকদের কৃষকদের আন্দোলনের থেকে শেখা উচিত কী ভাবে আইনী চক্রান্তগুলো কে পর্যদুস্ত করতে সরকার কে আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে চাপে ফেলে বাধ্য করতে হয় জনগণের দাবি মেনে নিতে। তাঁদের বোঝা উচিত যে শুধু অর্ধেক রাস্তা গেলেই হবে না, পুরোটা যাওয়া দরকার।

কৃষকেরা যেমন তিনটি কৃষি আইনের বাতিলের দাবি তুলেছিলেন, তেমনি নাগরিকত্ব আন্দোলনের প্রতিনিধিদেরও এনআরসি চক্রান্তের হোতা সিএএ ২০০৩ বাতিলের সাথে সাথে সিএএ ২০১৯ ও সিএএ ১৯৮৭ বাতিলের দাবি তোলা উচিত। কিন্তু এতেই সব নয়। কারণ ভারতে জন্মানো মানুষের যাতে জন্মগত ভাবে নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার নিঃশর্ত হয় আর দীর্ঘদিন ধরে ভারতে বসবাসকারী দেশভাগের শিকার উদ্বাস্তুদেরও নিঃশর্ত নাগরিকত্ব কে আইনী স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যাতে ভবিষ্যতে কোনো সরকার সেই অধিকার কেড়ে নিতে না পারে, তাই একটি নতুন নাগরিকত্ব আইনের দাবি করা দরকার যা নিঃশর্তে ভারতে বসবাস করা ও জন্মগ্রহণ করা প্রত্যেকেরই নাগরিকত্বের অধিকার সুনিশ্চিত করবে।

যদি কৃষকদের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের থেকে এই জরুরী শিক্ষা নিয়ে আপামর জনগণ কে নিয়ে নিঃশর্ত নাগরিকত্বের দাবিতে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলা না হয়, তাহলে সমূহ বিপদ, কারণ আগামী ২০২২ থেকেই শুরু হয়ে যাবে এনপিআর আপডেট করার কাজ, যা এনআরসি-র প্রথম ধাপ। এই মুহূর্তে যদি সেই পুরানো সিএএ ২০১৯ আর এনআরসি কে এক করে দেখানোর রেকর্ড বাজানো বন্ধ না হয়, তাহলে কোটি কোটি মানুষের নাগরিকত্ব মোদী সরকার কেড়ে নেবে আর তার ফলে বিজয়ী কৃষকদের আন্দোলনেও জোর ধাক্কা লাগবে। তাই অবিলম্বেই এই নিয়ে নাগরিকত্ব আন্দোলনের শরিকদের ভাবা উচিত ও পথে নামা উচিত। কারণ কৃষক আন্দোলন দেখিয়েছে যে পথেই পথ চলার দিশা পাওয়া যায়।

এই প্রবন্ধটি কি আপনার ভাল লেগেছে?

তাহলে মাত্র ১০০ টাকার থেকে শুরু করে আপনার সাধ্যমত আর্থিক সহায়তা করে আমাদের এই নির্ভীক ব্লগটি কে সহযোগিতা করুন

যেহেতু আমরা FCRA-তে পঞ্জীকৃত নই, অতএব ভারতের বাইরের থেকে সহযোগিতা আমাদের পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব নয়।

আপনার মতামত জানান