একটি অডিও ক্লিপ নেট জগতে ঘুরছে। সেই ক্লিপটি নাকি জনৈক এক খ্যাতনামা গায়কের আর কোন এক টিভি চ্যানেলের এক কর্মচারীর কথোপকথন। আর তাতেই সেই গায়কের উপর মোহভঙ্গ হয়েছে এরকম হা হুতাশ ভরা পোস্ট – এ সরগরম নেট দুনিয়া। তার গানের কথার সাথে তার ফোনের কথোপকথনের তুলনা করে অনেকেই বিষাদময় পোস্টে টাইমলাইন ভরাচ্ছেন।

দোষ তাতে নেই, নিজের মতামত দিতেই পারেন। প্রশ্ন হচ্ছে এতে চমকানোর মতন সত্যিই কি কিছু আছে। নাকি এটাই ভীষণ রকম ভাবে স্বাভাবিক। ভাষা কোনও সমাজের, সংস্কৃতির স্পষ্ট উচ্চারণের প্রতিধ্বনি। যখন আমাদের সংস্কৃতির, সমাজের সব স্তম্ভে পুরুষতন্ত্রের অবাধ দাপাদাপি, তখন জিভ সেই পুরুষতান্ত্রিক উচ্চারণে ধ্বনিত হবে এটাই তো স্বাভাবিক। প্রশ্ন আসতেই পারে যে তিনি তো একজন সৃষ্টিশীল মানুষ, কিন্তু একজন পুরুষ থেকে সৎ সৃষ্টিশীল সত্তা হিসেবে উত্তরণের জন্য যে পরিমাণ আনলার্নিং (unlearning) এর প্রয়োজন হয় এবং অপ্রিয় হওয়ার, পুঁজিবাজারের বিপরীতে হাঁটার যে দৃঢ়তা দরকার তা বেশিরভাগ মানুষই করে উঠতে পারেন না। তাই থেকে যায় পুঁজির, খ্যাতির লোলুপতায় সৃষ্ট সৃষ্টি এবং ব্যক্তিগত চরিত্রের বিশাল এক ফারাক। যে ফাঁক দিয়ে অনায়াসে গলে যায় নিজের মা বা অন্যের বোন, বউ এর প্রতি অশ্লীল মন্তব্য, খুব উঁচু স্বরে , কোনরকম রাখঢাক না রেখেই। কারণ সেই ব্যক্তিটিও জানেন, কিছুই হয় না তাতে, কিছুই ফারাক পড়বে না তার জনপ্রিয়তার বা ব্র্যান্ড ভ্যালুর।

যে দেশে নারীদের উপর অত্যাচার করেও বিধায়ক, মন্ত্রী হওয়া যায়। মি টু আন্দোলনের সাহসী মহিলারা প্রতি মুহূর্তে শোনেন কটূক্তি। দিব্যি দেশের বিচার ব্যবস্থার সর্বোচ্চ পদে আসীন হওয়া যায়, মেরিটাল রেপ এর বিরুদ্ধে আইন আনার ভাবনা চললে, চলে তার বিরুদ্ধে আন্দোলন, যে দেশে পার্লামেন্টে মহিলাদের সংখ্যা নগন্য, সেই দেশ এরকম কথা বললে যতটা বিরোধের ভয় থাকে, তার থেকে বেশি থাকে পুরুষতন্ত্রের, পেশীতন্ত্রের হাততালি পাওয়ার হাতছানি।

সংশ্লিষ্ট শিল্পীর কাছে একটু বেশি আশা ছিল সাধারণ মানুষের। থাকাটাই স্বাভাবিক। তিনি তার লেখনীতে বারবার দেখিয়েছেন আলাদা হওয়ার স্বপ্ন, তার গানে ছিল অন্যরকম হওয়ার এক ডাক যা পেশীবলে বিশ্বাসী পুরুষতন্ত্রের থেকে বেরিয়ে যাওয়ার এক প্রয়াস। কিন্তু যখন মতাদর্শ পুঁজির দিকে যাওয়ার এক মই মাত্র, তখন অসাবধানী মুহূর্তে আসল নখর বেরিয়ে ক্ষত বিক্ষত করবে নারী শরীর, এটাই প্রত্যাশিত।

এই যে বহু পোস্ট শিল্পীর অশালীন উচ্চারণের বিরুদ্ধে, তা আর আশা জাগায় না। সেই শিল্পীর মতন অনেকেই আছেন যারা নিজের পুঁজি কাজে লাগিয়ে আনলার্নিং করতে পারতেন, কিন্তু করেননি, করবেন না। আবার এই শিল্পী নতুন কোন গানে বিপ্লবের স্বপ্ন বাঁধবেন, বই চিবানো বিপ্লবীরা তালি দেবেন। মন্ত্রী হবেন, বা কোন দলের তারকা।

অসুবিধা হবে না কোন পুরস্কার পেতে।আর পুরুষতন্ত্রের উচ্চারণে মা, বোন, বউ একদলা মাংসপিণ্ড ছাড়া আর কিছুই বলে গণ্য হবে না, সেই মাংসপিণ্ড যাকে যখন তখন নিলাম করা যায় বুল্লি ডিল এ্যাপ বানিয়ে বা খিস্তি দিয়ে নিজের বিপ্লবী সত্তার মোক্ষ লাভ করা যায়।

ভোগের আহ্বান যখন পুরুষের কাছ থেকে, তখন সেই আহ্বানের ভাষায় রং, মতাদর্শ এগুলো ফিকে হয়ে যায়। কোন পার্থক্য থাকেনা সারাদিন শোষিত হয়ে ঘরে ফেরে যে শ্রমিক আর শোষণের থেকে মুক্তির স্বপ্নে যে গানওয়ালা গান বাধে।

অশ্লীলতার জন্য,ভণ্ডামির জন্য বিক্ষত করা দরকার সেই ভণ্ড শিল্পীদের যারা ভাবেন ফ্যাসিস্ট কে হারাতে গেলে মা, বোন সবার শরীর মলেস্ট করা যায়, ভাবেন নারীরা কোলাটেরাল ড্যামেজ। এঁরা ব্যতিক্রমী নন, এঁরা শত্রু। শত্রু ওঁরা নন যাদের সুযোগ নেই শিক্ষার, শত্রু এঁরা যারা শিক্ষার পুঁজি থেকেও গা ভাসান জোয়ারে। এঁরা প্রয়োজন হলে ক্ষমা চাইবেন, আর ক্ষমা না চাইলে সুবিধে হলে চাইবেন না। যদি চান, তবে সেই ক্ষমার মধ্যেও থেকে যাবে আন্তরিকতার অভাবের প্রশ্ন। দরকার এঁদের সামনে এঁদের নির্লজ্জতার আয়না তুলে ধরা।

কিন্তু এঁদের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে, মুখ টিপে হাসছে অসংখ্য চোখ। এঁদের গলায় শুধু মালা দেবার অপেক্ষায়।

এই প্রবন্ধটি কি আপনার ভাল লেগেছে?

তাহলে মাত্র ৫০০ ভারতীয় টাকার থেকে শুরু করে আপনার সাধ্য মতন এই ব্লগটি কে সহযোগিতা করুন

যেহেতু আমরা FCRA-তে পঞ্জীকৃত নই, অতএব ভারতের বাইরের থেকে সহযোগিতা আমাদের পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব নয়।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

CAPTCHA


পিপলস রিভিউ বাংলা