২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন শুরুর আগেই প্রায় স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে যে শাসকদল বিজেপি কারচুপি করে ও প্রশাসন কে ব্যবহার করে জিতবে। তাহলে এই অভিযোগ করেও কেন বিরোধীরা নির্বাচনে সামিল হচ্ছেন?

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন শুরু হওয়ার আগেই ভারতের সংসদীয় বিরোধী দলগুলো ভীষণ বিপাকে পড়েছে।

তাদের অবস্থা আক্ষরিক অর্থেই শ্যাম রাখি না কুল রাখি।

সম্প্রতি দিল্লীর মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল গ্রেফতার হওয়ার পর থেকেই আবার তাদের বিরোধিতার সুর তীব্র হয়েছে। অনেকেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর – নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) শাসনকে ১৯৭৫-৭৭ পর্যন্ত চলা জরুরী অবস্থার সাথেও তুলনা করছেন।

যদিও বিরোধীরা মোদী সরকার কে দেশে গণতন্ত্র ধ্বংস করার ও স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার দোষী সাব্যস্ত করেছে, তবুও চূড়ান্ত রকমের ধৃষ্টতা দেখিয়ে এই বিরোধী শক্তিই কিন্তু মোদী সরকার কে ও বিজেপিকে নিজের স্বৈরতন্ত্র কে পোক্ত করার রাস্তা তৈরি করে দিয়েছে।

কী ভাবে?

বিরোধীদের অভিযোগ

বিরোধীদের কয়েকটি বড় অভিযোগ আছে বিজেপির এবং মোদী সরকারের বিরুদ্ধে:

১. প্রশাসন কে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা

বিরোধীদের অভিযোগ যে মোদী সরকার কেন্দ্রীয় তদন্ত এজেন্সিগুলোর স্বায়ত্ব শাসন শেষ করে সেগুলোকে বিরোধীদের দমন পীড়ন করতে ব্যবহার করছে।

ফলে, দেখা যাচ্ছে যে বিজেপির বিরোধী দলগুলোর নেতাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে, তাঁদের বাড়িতে হানা দিচ্ছে কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো (সিবিআই), আয়কর দফতর (আইটি) আর এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। হেমন্ত সোরেনের পর প্রথম কার্যরত মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল গ্রেফতার হলেন। আম আদমি পার্টি (আপ), ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা (জেএমএম) ভারত রাষ্ট্র সমিতি (বিআরএস), তৃণমূল কংগ্রেস সহ নানা বিরোধী দলের নেতাদের গ্রেফতার করেছে বিজেপির এজেন্সিগুলো নানা অভিযোগে। আবার এই সমস্ত দুর্নীতি ও তছরুপের তদন্তের থেকে একজন ছাড় পেয়ে যাচ্ছে বিজেপিতে যোগ দিয়ে।

সম্প্রতি, সংযুক্ত গণতান্ত্রিক মোর্চা (ইউপিএ) আমলে বিমান পরিবহন মন্ত্রী থাকা প্রফুল্ল প্যাটেল বিজেপির মহারাষ্ট্রের জোট সঙ্গী অজিত পাওয়ার-নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস পার্টিতে (এনসিপি) যোগদান করার পরেই তাঁর নামে চলা বিমান সংস্থা-সংক্রান্ত দুর্নীতির মামলায় সিবিআই তদন্ত বন্ধ হয়েছে।

২. নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতিত্ব

গত কয়েক বছর ধরেই বিরোধীরা নির্বাচন কমিশন কে বিজেপির হাতিয়ার হিসাবে তুলে ধরছে। তাদের অভিযোগ বারবার নির্বাচন কমিশন বিজেপির পক্ষে দাঁড়িয়ে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বাঁধা দিচ্ছে।

২০১৯ সালের তুলনায় ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে কমিশন যে বিজেপির হয়ে বেশি পক্ষপাতিত্ব করবে সেটার ইঙ্গিত আগেই পাওয়া গেছিল। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে ১৪০ জনের উপর বিরোধী সাংসদদের অধিবেশন থেকে বহিস্কার করে মোদী সরকার নানা জনবিরোধী আইনের সাথেই নির্বাচন কমিশন নিয়োগের নিয়মাবলীও পরিবর্তন করে নেয়।

আগে যেখানে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার সহ আরও দুই নির্বাচন কমিশনার কে নিয়োগ করার জন্যে গঠিত তিন সদস্যের প্যানেলে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দল নেতা ও দেশের প্রধান বিচারপতি থাকতেন, সেই প্যানেলের নিয়মাবলী পরিবর্তন করে মোদী সরকার প্রধান বিচারপতিকে সরিয়ে তাঁর জায়গায় এনেছে প্রধানমন্ত্রীর চয়ন করা একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কে। অর্থাৎ যে ভাবেই হোক, নির্বাচন কমিশনের সর্বোচ্চ নিয়োগে বিজেপিরই প্রভাব থাকবে।

তাই, দীর্ঘদিন ধরে ভারতে তিন জন নির্বাচন কমিশনারের জায়গায় দুই জন থাকলেও সরকারের টনক নড়েনি। লোকসভা নির্বাচনের দিনক্ষণ প্রকাশের আগেই হঠাৎ মোদী-ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত এক নির্বাচন কমিশনার ‘ব্যক্তিগত’ কোনো কারণে পদত্যাগ করেন। সাথে সাথেই সরকার হঠাৎ এক দিনের নোটিসে, বিরোধী দল নেতা——লোকসভায় কংগ্রেস পার্টির নেতা অধীর চৌধুরী——কে নতুন কমিশনার পদপ্রার্থী দের তালিকা মাঝরাতে পাঠিয়ে পরের দিনই নিজের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ব্যবহার করে দুই নির্বাচন কমিশনার কে নিয়োগ করে।

চৌধুরী জানিয়েছেন তিনি নিজের মতামত দিতে অস্বীকার করেন অত্যন্ত কম সময় দেওয়ার বিরোধিতা করে।

এর ফলে এই নির্বাচন কমিশন যে কী ধরণের নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনা করবে সেটা বলাই বাহুল্য।

৩. আর্থিক শক্তি

সাম্প্রতিক কালে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলো কোন কোন সংস্থার থেকে কত টাকা করে আর্থিক অনুদান পেয়েছে তার তালিকা প্রকাশ করে ভারতীয় স্টেট ব্যাঙ্ক।

বলাই বাহুল্য, দেখা গেছে যে ২০১৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলো কে দেওয়া ১২,১৫৫.৫১ কোটি টাকার সিংহ ভাগ, ৪৬.০২% বা ৫,৫৯৪.২ কোটি টাকা গেছে বিজেপির ঘরে। এর পরে তৃণমূল কংগ্রেস দুই নম্বর স্থানে, যারা পেয়েছে ১,৫৯২.৫২ কোটি টাকা বা মোট বন্ডের ১৩.১০%, তার পরে তৃতীয় স্থানে আছে প্রাচীন কংগ্রেস পার্টি, যারা পেয়েছে ১,৩৫১.০৯ কোটি টাকা বা মোট অর্থের ১১.১৬%।

নির্বাচনী বন্ডে নানা ধরণের দুর্নীতির সাথে জড়িত বা সরকারি বরাত পাওয়া সংস্থাগুলোর থেকে মোটা অঙ্কের টাকা বিজেপি ও অন্যান্য দলে ঢুকতে দেখা গেছে। দেখা গেছে কী ভাবে ইডি-সিবিআই তদন্তের চাপ দিয়ে কর্পোরেট সংস্থাগুলোর থেকে একপ্রকার তোলা তুলেছে বিজেপি। কিন্তু তাতেই কি খেলা শেষ হলো?

এত অর্থবলে বিরোধীদের মাত করে দিতে সক্ষম বিজেপি তাও নিশ্চিত হতে পারছে না। ফলে কংগ্রেস পার্টি, বামপন্থী ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিআই) ও সিপিআই (মার্কসবাদী) কে আয়করের নোটিস ধরানো হয়েছে। কংগ্রেস পার্টির ব্যাঙ্ক একাউন্ট আইটি দখল করে নিয়েছে। নির্বাচনের মুখে বিরোধী দলগুলোর আর্থিক রসদ জোগানোর রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া মানেই অসম প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করা। আর এই কাজে বিজেপি কোনো ধরণের ফাঁকফোঁকর রাখেনি বলেই অভিযোগ।

৪. বিচার ব্যবস্থা কে নিয়ে প্রশ্ন

মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার চার বছরের মাথায়, ২০১৮ সালে এক অভূতপূর্ব প্রেস কনফারেন্স করেন সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন চার বিচারপতি, যাঁরা অভিযোগ করেন যে তাঁদের উপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হচ্ছে, বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা লঙ্ঘন করা হচ্ছে। এর পরে নানা হৈচৈ হলেও তাঁর বিরুদ্ধে একটি যৌন হয়রানির মামলা হওয়ায় হঠাৎ কেমন পিছু হঠেন ওই চারজনের অন্যতম, বিচারপতি রঞ্জন গগৈ। পরে তাঁর এজলাস রাফাল জঙ্গী বিমান কেনার দুর্নীতির অভিযোগের মামলায় মোদী সরকার কে রেহাই দেওয়া হয়।

এক বছরের মাথায়, ২০১৯ সালের নভেম্বরে সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ, যাতে গগৈ (তখন প্রধান বিচারপতি) ছাড়াও সেই বিক্ষুব্ধ বিচারপতিদের অন্যতম, বর্তমান প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড় ছিলেন, অযোধ্যায় ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙা কে গর্হিত অপরাধ বলে ভর্ৎসনা করলেও সেই ধংস্বস্তুপে রাম মন্দির তৈরির আদেশ দেয়। এই রাম মন্দির বর্তমানে বিজেপির প্রচারের শীর্ষে, যা ব্যবহার করে দেশে চূড়ান্ত মাত্রায় সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ করার চেষ্টা চলছে।

সেই গগৈ অবসর নেওয়ার কিছুদিন পরেই বিজেপির সমর্থনে রাজ্যসভায় মনোনীত সাংসদ হন। তিনি আজও সরকার কে কোনো প্রশ্ন করেননি। গগৈ নিজের অবসর অবধি অপেক্ষা করলেও, কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি অভিজিত গাঙ্গুলি সেটা করেননি। তিনি হঠাৎ তাঁর পদত্যাগের ঘোষণা করেন ও তারপরেই তিনি বিজেপিতে যোগ দেন।

উত্তর প্রদেশের বেনারসে, মোদীর নিজের কেন্দ্রে, জ্ঞানভাপি মসজিদের ভেতর অযোধ্যার বাবরি মসজিদের মতনই হিন্দু পক্ষ কে পূজা অর্চনা করার অনুমতি দিয়েছে আদালত। সেই বিচারপতির অতিরিক্ত যোগী আদিত্যনাথ ভক্তি, ও হিন্দুত্ব্ববাদী রাজনীতির সমর্থন দেখে অসন্তুষ্ট হয়ে এক মামলার রায়ের থেকে তাঁর টিপ্পনি বাদ দেওয়ার হুকুম দেয় এলাহাবাদ হাইকোর্ট।

এ ছাড়াও নানা ভাবে, নানা আদালতে, বিজেপি বা মোদী সরকার সুবিধা পাচ্ছে বলেও বিরোধীরা অভিযোগ করছেন বিক্ষিপ্ত ভাবে। বিশেষ করে কলকাতা হাইকোর্টের কিছু আদেশ ও বিচারপতিদের কটূক্তি আদতে বিজেপি কে মদদ করছে বলে রাজ্যের শাসক দলের তরফ থেকে অভিযোগ করা হয়। সামাজিক মাধ্যমেও অনেকেই আদালতের রায়ের বিরোধিতা করা শুরু করেছেন যা দেশের বিচার ব্যবস্থার পক্ষে মোটেও ভালো ব্যাপার নয়।

বিরোধীদের উল্টোপুরাণ

এত অভিযোগ প্রশ্ন তোলে আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে। মোদী নির্বাচন ঘোষণার আগের থেকেই বলে আসছেন যে আগামী নির্বাচনে বিজেপি ৩৭০টি আসন ও জাতীয় গণতান্ত্রিক মোর্চা (এনডিএ) ৪০০-র বেশি আসন জিতবে। এই আত্মবিশ্বাসের পিছনে নির্বাচনী বন্ডের মোটা টাকা, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের উপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে বিরোধীদেরই একটা বড় অংশ অভিযোগ করছে।

বিরোধীরা বারবার ২০২৪ সালের নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে কিনা, স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু হবে কিনা, সেই নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। কিন্তু এই প্রশ্ন তোলার পরেও কিন্তু সব দলই লোকসভা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে, নিজেদের তহবিল থেকে অর্থ খরচ করে বিজেপির সাথে এক অসম প্রতিযোগিতায় নামছে। কিন্তু কেন?

যদি বিরোধীদের অভিযোগ সঠিক হয় তাহলে আসন্ন লোকসভা নির্বাচন প্রহসন ছাড়া কিছুই নয়——ঠিক পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত নির্বাচনের মতন। কিন্তু তাহলে প্রতিবেশী বাংলাদেশের মতন মোদী সরকারের বিরোধীরাও কেন নির্বাচন কে প্রহসন বলে সেটার বিরোধিতা করছে না বা বয়কটের ডাক দিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করছে না?

ভারতবর্ষে উগ্র-বামপন্থী শক্তি ও কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদী জঙ্গী সংগঠন ছাড়া কোনো মূলস্রোতের দলই নির্বাচন বয়কটের ডাক দেয়নি। অথচ প্রতিবেশী বাংলাদেশে, নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বৈরতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ও আওয়ামী লীগের ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ আগে থেকেই তুলে সেখানে সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচন বয়কটের ডাক দিয়েছিল বিরোধী দলগুলো। ফলে, বিশ্বের দরবারে সেই নির্বাচনের কোনো মূল্য থাকলো না।

কেন ভারতের বিরোধী দলগুলো বাংলাদেশের পথে হাঁটতে সাহস দেখালো না?

যে প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা বিলোপ হয়ে গেছে বলে বিরোধীরা অভিযোগ তুলছে, কথায়-কথায় সেই প্রতিষ্ঠানগুলোরই দ্বারস্থ হয়ে কেন সেগুলোকেই আবার ঘুরিয়ে মান্যতা দিচ্ছে তারা?

আরও একটি তুরস্ক?

অনেক বিরোধীরাই মোদী সরকারের সাথে এডল্ফ হিটলারের নাৎসি জার্মানির তুলনা করেন। কিন্তু আদতে বর্তমান বিশ্বে যে অতি-দক্ষিণ, নয়া-উদারনৈতিক বাজারপন্থী কট্টর রক্ষণশীল শক্তির উদ্ভব হয়েছে সেই পরিপ্রেক্ষিত থেকে দেখতে গেলে ভারতের তুলনা করা যেতে পারে রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান-শাসিত তুরস্কের। মুস্তফা কেমাল-গঠিত স্বাধীন ও ধর্মনিরপেক্ষ তুরস্ককে যে ভাবে ধর্মীয় মেরুকরণ ও মৌলবাদী রক্ষণশীলতার বেড়ি বেঁধে এরদোয়ান নিজের শাসন কে পোক্ত করেছেন ও বিরোধীদের নখ-দন্তহীন করে দিয়েছেন, সেই মডেলেই বিজেপি-শাসিত ভারত এগিয়ে চলেছে বলে. বোঝা যাচ্ছে।

এরদোয়ানের মতন মোদীর বিরোধীরাও তাঁর শাসনে সমস্ত প্রশাসনের উপর বিজেপির নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ তুলেও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন শুধু বিরোধীদের আসন সংখ্যা সংসদে বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে, ক্ষমতা দখলের জন্যে নয়। এর মধ্যে ধাক্কা খেতে খেতে প্রান্তিক হয়ে যাওয়া বামপন্থীদের দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে নিজেদের দলগুলোর জাতীয় পার্টির তকমা ধরে রাখার মতন ভোট জোগাড় করার।

তাই মোদী সরকার যে সামগ্রিক ভাবে সরকারি যন্ত্র কেই নয়, বরং গোটা রাষ্ট্র যন্ত্র কে, এমনকি দেশের নিরপেক্ষ থাকা সেনাবাহিনীকেও রাজনৈতিক স্বার্থে কাজে লাগাচ্ছে, সেই অভিযোগ তুলেও এই ব্যবস্থার ভিতরেই নিজেদের টিকিয়ে রাখার প্রয়াস চালাচ্ছে বিরোধী দলগুলো। তাই যে কংগ্রেস পার্টি ভারতে নয়া-উদারনৈতিক অর্থনীতির দ্বার উন্মুক্ত করেছিল ও কর্পোরেট শাসনের পথ প্রশস্ত করেছিল তাকে শিখণ্ডি করেই পথে এগোচ্ছে সমস্ত বিরোধী দলগুলো।

গন্তব্য কোথায়?

ভারতের গণতন্ত্রের শুরুর থেকেই হোঁচট খাওয়ার পরম্পরা বজায় রয়েছে। যে রাজা-মহারাজা আর জমিদারদের শাসন বিলোপ করে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রজাতান্ত্রিক সরকার গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সংবিধান গৃহীত হয়েছিল ১৯৪৯ সালের নভেম্বর মাসে, নির্বাচনের সময়েই দেখা গেল রাজা-মহারাজাদের প্রতিপত্তি বজায় রাখার স্বার্থে কংগ্রেস থেকে শুরু করে নানা দক্ষিণপন্থী দল তাদেরই নির্বাচনে টিকিট দিয়ে জিতিয়ে জনপ্রতিনিধি করলো। জনগণের কতটা প্রতিনিধিত্ব আইন সভায় হলো সেটা বোঝা না গেলেও এই পরগাছা শ্রেণীর রাজনৈতিক প্রতিপত্তি কিন্তু বজায় থাকলো চিরকাল। তারই ফলস্বরূপ আজ দেখা যায় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ও তাদের গোমস্তা মীর জাফরের সাথে হাত মিলিয়ে পলাশীর প্রান্তরে সিরাজ উদ-দৌল্লা কে পরাস্ত করার অপরাধী মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের বংশের বধূ কে——পোশাকি নাম ‘রাজমাতা’——নির্বাচনের টিকিট দেয় বিজেপি।

এই ধারা কে যে বিরোধী দলগুলো সমান ভাবে প্রশ্রয় দিয়ে এসেছে, যাদের শাসনকালে যারা নিজেরা ভারতের প্রশাসন ও বিচার বিভাগের স্বতন্ত্রতা কে কখনো মান্যতা দেয়নি বা রাজনৈতিক স্বার্থের থেকে মুক্ত থাকতে দেয়নি, তারা আজ কী ভাবে মোদীর ছেলেখেলার নির্বাচনের বিরোধিতা করবে? কী ভাবে তারা আজ বলবে দেশের জনগণ কে যে ব্রাক্ষণত্ববাদী যে প্রতিষ্ঠানকে তারা শক্ত পোক্ত করেছে সেই প্রতিষ্ঠানই আজ গণতন্ত্রের গোঁড়ায় কুঠারাঘাত করছে, জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুন্ন হচ্ছে?

ফলে বিজেপির বিরুদ্ধে জেতার কোনো সম্ভাবনা না থাকলেও ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন কে মান্যতা দেবে বিরোধী দলগুলো। হয়তো বা শেষ বারের মতনই। কিন্তু এ ছাড়া তাদের কাছে আর কোনো গতি নেই। বিজেপিকে সম্মুখ সমরে যে হারানোর কোনো ইচ্ছাই সর্ববৃহৎ বিরোধী দল কংগ্রেস পার্টির নেই সেটাও বোঝা গেল যখন গত পাঁচ বছর ধরে বিজেপির বিরুদ্ধে গলা ফাটিয়ে, দেশ জুড়ে পদযাত্রা করে, শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের সময়ে বিজেপির শক্ত ঘাঁটি উত্তরপ্রদেশে তাঁর সাবেক কেন্দ্রে প্রার্থী না হয়ে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী চলে যান কেরলে, বামপন্থীদের বিরুদ্ধে——যাদের সাথে আবার দলটি কেন্দ্রীয় স্তরে জোট বেঁধেছে——ভোটে লড়তে।

যখন বিজেপি-বিরোধী মুখেরই এই ধৃষ্টতা জনসমক্ষে রয়েছে তখন স্পষ্টত বোঝা যাচ্ছে যে না গণতন্ত্র না দেশের জনগণের স্বার্থ, কংগ্রেস একমাত্র নিজের অস্তিত্ব কে রক্ষা করতে চায় আর সেই কাজটাই কতিপয় বিজেপি-বিরোধী সাজা পরিবার-চালিত দল করতে চায়। ফলে এই নির্বাচন তাদের স্বার্থ সিদ্ধির নির্বাচন, তাই তারা শত ছলনা সত্ত্বেও এই প্রহসনে অংশগ্রহণ করবে ও ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির বিজয় কে মান্যতা দেবে।

এই প্রবন্ধটি কি আপনার ভাল লেগেছে?

তাহলে মাত্র ৫০০ ভারতীয় টাকার থেকে শুরু করে আপনার সাধ্য মতন এই ব্লগটি কে সহযোগিতা করুন

যেহেতু আমরা FCRA-তে পঞ্জীকৃত নই, অতএব ভারতের বাইরের থেকে সহযোগিতা আমাদের পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব নয়।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

CAPTCHA


পিপলস রিভিউ বাংলা – People's Review Bangla