মমতার বিজেপি-বিরোধী মঞ্চ: বিরোধী হয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ কোন পথে?
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উপস্থিতিতে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শুভেন্দু অধিকারীর শপথ নেওয়া নিয়ে যখন বাংলার ও ভারতের হিন্দি-ইংরেজি সংবাদমাধ্যম ব্যস্ত, তখনই অন্যদিকে খুব অনাড়ম্বরে নিজের বাস ভবনের কাছে একটি রবীন্দ্র জয়ন্তী উৎসব পালন করেন সদ্য প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী হওয়া মমতা বন্দোপাধ্যায়। আর এই অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকেই তিনি আগামীর একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সমীকরণ গড়ে তোলার প্রস্তাব রাখলেন। তৃণমূল কংগ্রেস দলের কিছু বিধায়ক ও সমর্থকদের সাথে অনুষ্ঠিত এই সভায় বন্দোপাধ্যায় একটি বৃহৎ বিজেপি-বিরোধী মঞ্চ গড়ে তোলার ডাক দেন।
বিজেপি-বিরোধী এই প্রস্তাবিত মঞ্চে তিনি সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর সাথে বাম ও অতি-বাম সংগঠনগুলোকেও আহ্বান জানান এবং পশ্চিমবঙ্গ কে বাঁচানোর ও বিজেপিকে হারানোর লড়াই করার উপর জোর দেন।
এই আহ্বান আসলে তাঁর বিজেপি-বিরোধী অবস্থান কে ধরে রাখার ও মুখ্য বিরোধী থাকার প্রয়াসকে প্রকাশিত করলো বলে মনে করা হচ্ছে।
বিজেপি-বিরোধী মঞ্চ: বন্দোপাধ্যায় রবীন্দ্র জয়ন্তীতে বাম-কংগ্রেস কে রাজনৈতিক চাপে রাখলেন
যদিও রাজ্যের বাম ও কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে তাঁর ১৫ বছরের শাসনের অবসান কে খোলাখুলি ভাবে স্বাগত জানিয়েছে, তারপরেও বন্দোপাধ্যায় তাঁদের বিজেপি-বিরোধী মঞ্চে যোগ দেওয়ার ডাক দিয়ে রাজনৈতিক ভাবে চাপে ফেলবেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
এর কারণ হলো, প্রবল প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার স্রোতের মধ্যেও তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যের ২.৬০ কোটি মানুষের ভোট পেয়েছে, যা বাম ও কংগ্রেস অস্বীকার করতে পারে না। আসন সংখ্যার হিসাবে তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গের প্রধান বিরোধী দল এবং ২০০৬ সালের নির্বাচনের থেকে ভালো পরিস্থিতিতে রয়েছে।
যদিও প্রশ্ন উঠেছে যে বন্দোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের ৮০ জন বিধায়ক ও লোকসভায় ২৯টি ও রাজ্য সভায় ১৩টি সাংসদ কতদিন তাঁর প্রতি আনুগত্য দেখাবেন ও বিজেপিতে যোগদান করবেন না, তিনি জানান দিয়েছেন যে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে তিনি নড়ছেন না।
তাই তৃণমূল কংগ্রেস কে বিজেপি-বিরোধী শক্তি হিসাবে ২০২৯ এর লোকসভা নির্বাচন ও ২০৩১ এর বিধানসভা নির্বাচনের আগেই খারিজ করে দেওয়া বাম বা কংগ্রেসের পক্ষে সম্ভব নয়।
অন্যদিকে তাঁর আহ্বান কে এবার “সেটিং” তত্ত্ব আউড়ে বা তাঁর শাসনকালের কথা তুলে খারিজ করলে কংগ্রেস ও বামেদের পক্ষে রাজ্যে নিজেদের বিজেপি-বিরোধী ইমেজ কে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেওয়া হবে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু ভোটের ক্ষেত্রে।
বন্দোপাধ্যায়ের এই রবীন্দ্র জয়ন্তী অনুষ্ঠানের মঞ্চে তাঁর ঘনিষ্ঠ প্রাক্তন সাংবাদিক সুমন ভট্টাচার্য তুলে ধরলেন যে রাজ্যের নির্বাচনী ফলাফল দেখাচ্ছে যে তৃণমূল কংগ্রেস, কংগ্রেস ও বামেদের যৌথ ভোটের হার বিজেপির চেয়ে বেশি। আর বিজেপি-বিরোধী জায়গায় তাই সবার থাকা উচিত বলে অন্যরাও মত দেন।
বিরোধী থাকার সমস্যা
এই অনুষ্ঠানে বন্দোপাধ্যায়ের বক্তব্যে স্পষ্ট হয় তিনি বিজেপি-বিরোধী মঞ্চের নামে পথে থাকার চেষ্টা করবেন। এর ফলে তাঁর দলে অভিষেক বন্দোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ নেতারা দলত্যাগ করলেও পুরানো মমতা-পন্থী তৃণমূল কংগ্রেস নেতা ও কর্মীরা দলে থাকবেন বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে এই টিকে থাকার অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে।
তৃণমূল কংগ্রেসের মতন দক্ষিণপন্থী দলের জনগণের থেকে চাঁদা তোলার রেওয়াজ নেই। বিগত দিনে ইলেকটোরাল বন্ডের তথ্যে দেখা গেছে যে দলটির মূল আর্থিক ইঞ্জিন ছিল বৃহৎ কর্পোরেট চাঁদা। আর এই চাঁদা এসেছে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার চালানোর কারণে।
পশ্চিমবঙ্গে বিরোধীরা অভিযোগ করেন দলটির নেতা ও কর্মীরা চিরকাল পঞ্চায়েত স্তর থেকে দুর্নীতি করে কোটি কোটি টাকা আয় করেছে সরকারি ব্যবস্থার দুর্ব্যবহার করে। এই টাকার অনেকটাই তারা দলটিকেও জুটিয়েছে বলে অভিযোগ করেন বাম, কংগ্রেস থেকে বিজেপি।
তাই রাজ্যে বিরোধী হিসাবে থাকলে তৃণমূল কংগ্রেস এই সকল অর্থের যোগান থেকে বঞ্চিত হবে। এর ফলে মমতা-পন্থী পুরানো কিছু কট্টর তৃণমূল কংগ্রেস নেতা কর্মী, যাঁরা এখন অনেকেই বয়স্ক, ছাড়া বাকি যারা ২০১১ সালের পর থেকে দলটিতে যোগ দিয়েছিলেন ক্ষমতার কাছে থাকতে তাদের কয়জন দলে টিকে থাকে সেটাও এখন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা পর্যবেক্ষণ করছেন।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ কী?
তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থান হয়েছিল বামফ্রন্ট বিরোধিতার থেকে ও কংগ্রেস ভেঙে। এই উত্থানের শুরুতে বিজেপির মদদ ছিল এই ঘটনাটি তৃণমূল কংগ্রেস ও গেরুয়া শিবিরের নেতারা স্বীকার করেন। বামফ্রন্টের পতনের পরে তৃণমূল কংগ্রেস তার রাজনৈতিক পরিচয় খুঁজে পায় সরকারে থাকার মধ্যে ও তার মধ্যে দিয়ে কখনো কেন্দ্রীয় বঞ্চনা, কখনো বাঙালি জাতীয়তাবাদ বা কখনো ধর্মনিরপেক্ষতার পতাকা ধরে নিজেকে প্রাসঙ্গিক রাখার ও ভোট ব্যাঙ্ক ধরে রাখার চেষ্টা করে যায়। কিন্তু নীতিগত কোনো অবস্থান না থাকায় তৃণমূল কংগ্রেসের দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের রাজনীতি বিজেপিকে পশ্চিমবঙ্গে বৃদ্ধি পেতে সহযোগিতা করেছে। তারপরে ২০২১ এর পর নরম হিন্দুত্ববাদের পথ ধরে বন্দোপাধ্যায় বিজেপির নকল করতে গিয়ে গেরুয়া শিবিরের সুবিধাও করে দিয়েছেন।
এহেন তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো ৭০ বছর পার করে নতুন করে নিজেকে রাস্তায় লড়াই করা বিরোধী নেত্রী প্রমাণ করতে পারবেন কিনা সেটা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন যেমন, তেমনি তাঁর আমলের দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের ঘটনাকে চাপা দিয়ে তাঁর হাত ধরতে বাম বা কংগ্রেস রাজি হবে কিনা সেই প্রশ্নও রয়েছে।
এ ছাড়াও, বন্দোপাধ্যায় পরবর্তী তৃণমূল কংগ্রেসের অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। মনে করা হচ্ছে যে দলের অধিকাংশ নেতা কর্মী বিজেপিতে চলে যাওয়ার পরে যাঁরা তৃণমূল কংগ্রেসে থাকবেন, তাঁদের বড় অংশটি বন্দোপাধ্যায় না থাকলে কংগ্রেসে যোগদান করতে পারে আর একটি ক্ষুদ্র অংশই বাংলা কংগ্রেসের মতন স্বাধীন ভাবে টিকে থাকতে পারবে।
এই সংখ্যার বিচারে শেষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বামেদের থেকে সুবিধাজনক অবস্থানে কংগ্রেস চলে আসতে পারে এবং ২০১৬ সালের পরে, বন্দোপাধ্যায়-পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তারাই প্রধান বিরোধীর ভূমিকা পালন করতে পারে তৃণমূল কংগ্রেস থেকে আগত ভোটব্যাঙ্ক কে সম্বল করে।
একই ভাবে বিজেপি প্রচেষ্টা করে যাবে প্রধান বিরোধী জায়গাটা যেন বন্দোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস দখল করে রাখে। এর ফলে আগামী ১০ বছর অতীতের সন্ত্রাস ও দুর্নীতিকে দেখিয়ে ও সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ করে হিন্দু ভোট কে এক জায়গায় রেখে খুব সহজেই নির্বাচনী বৈতরণী বিজেপি পার করতে পারবে।
এখন দেখার বিষয় হলো তৃণমূল কংগ্রেসের সাথে রবীন্দ্র জয়ন্তীর অনুষ্ঠান থেকে বাম, কংগ্রেস ও অন্যান্য শক্তিকে যে ভাবে বন্দোপাধ্যায় একজোট হওয়ার ডাক দিলেন, তাতে তিনি কি কোনো সাড়া আদেও পাবেন না কি এই আহ্বান কে ব্যবহার করে তিনি নিজেকেই একমাত্র বিজেপি-বিরোধী বলে রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত রাখবেন।

