হকার উচ্ছেদ নাকি কর্পোরেট ভারতের জন্য শহর পরিষ্কার?
হাওড়া, শিয়ালদহ থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন রেল স্টেশন চত্বরে “অ্যান্টি-এনক্রোচমেন্ট” অভিযানের নামে হকার উচ্ছেদ কর্মসূচি চালাচ্ছে কেন্দ্রীয় রেল মন্ত্রক। তাকে রাজ্যের নব্য গঠিত ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সরকার “জনস্বার্থে সরকারি জমি উদ্ধার” বলে তুলে ধরছে। উত্তর প্রদেশের থেকে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সাধের বাহন হয়েছে বুলডোজার। সেই বুলডোজার চলছে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে গরিব মানুষের উপর। রাজ্য জুড়ে কেন্দ্রীয় সরকারের রেল দফতরের জমিতে তৈরি হওয়া দোকান ভাঙা হচ্ছে, ফুটপাত ও স্টেশন চত্বর খালি করা হচ্ছে।
হকার উচ্ছেদ নিয়ে বিজেপির সমর্থকরা বলছেন— “আইন সবার জন্য সমান”, “দখলদারিত্ব চলবে না”, “স্টেশন পরিষ্কার হোক”। তাঁরা বলছেন যাঁদের হকার উচ্ছেদ হওয়ার জন্যে কষ্ট হচ্ছে তাঁরা যেন সেই উৎখাত হওয়া মানুষদের নিজেদের বাড়ির ছাদে বসান। কিন্তু ঘটনা হলো শ্রমজীবী জনগণ রেল স্টেশন বা বাস স্ট্যান্ড সংলগ্ন অঞ্চল থেকে জরুরি ভিত্তিতে নানা কিছু কিনে থাকেন, চা খান, খাবার খান, বা কখনো বাজার করেন। সেগুলো করতে তাঁরা যে কোনো ব্যক্তিগত মালিকানাধীন বাড়ির ছাদে যাবেন না সেটা বলাই বাহুল্য। অথচ নিজেদের প্রতি পদে গরিব ও খেটে খাওয়া মানুষের বিপরীতে দেখতে উদগ্রীব বিজেপি কর্মী ও সমর্থকদের কাছে কোনো যুক্তিই কখনো ধোপে টেকে না।
কিন্তু প্রশ্ন হল— কার বিরুদ্ধে এই হকার উচ্ছেদ অভিযান? কার জন্য এই পরিষ্কার অভিযান?
যে হকারকে আজ উচ্ছেদ করা হচ্ছে, সে কোনো বহুজাতিক কর্পোরেট নয়। সে কোনো হাজার কোটি টাকার ঋণখেলাপি নয়। সে কোনো বিমানবন্দর, বন্দর বা খনি দখল করে বসে নেই। সে একজন ছোট বিক্রেতা— যে চা বিক্রি করে, ফল বিক্রি করে, জামাকাপড় বিক্রি করে, সস্তায় মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটায়। তার দোকান মানে শুধু একটি স্টল নয়; একটি পরিবারের ভাতের থালা, সন্তানের স্কুলের ফি, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ওষুধ।
ভারতের মতো দেশে, যেখানে কর্মক্ষম জনসংখ্যা ৫৫ কোটিরও বেশি, সেখানে বিজেপি-ঘনিষ্ঠ বলে অভিযুক্ত গৌতম আদানির ‘আদানি এন্টারপ্রাইজের’ সরাসরি কর্মসংস্থান মাত্র প্রায় ৩৬ হাজার এবং মুকেশ আম্বানির রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড নিয়োগ করেছে প্রায় প্রায় ৩.৮৯ লক্ষ মানুষকে। অর্থাৎ দুই কর্পোরেট মিলিয়েও দেশের কর্মক্ষম মানুষের ০.১% কমকে সরাসরি চাকরি দেয়। অথচ এই কর্পোরেট গোষ্ঠীগুলির জন্য কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদীর সরকার হাজার হাজার কোটি টাকার করছাড়, ঋণ মকুব, জমি হস্তান্তর এবং সরকারি সম্পদের বেসরকারিকরণ অব্যাহত রেখেছে।
এবং এর ফলে সরাসরি ক্ষতি হয়েছে দেশের জনগণের করের টাকায় চলা সরকারি কোষাগারের।
২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত প্রায় ১৬.৩৫ লক্ষ কোটি টাকার ব্যাঙ্কের ‘খারাপ ঋণ’ রাইট-অফ, বা মকুব, করা হয়েছে। এই ঋণ মকুবের সিংহ ভাগ, বা পুরোটাই করেছে দেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাঙ্কগুলো। এই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলোর থেকে কর্পোরেটদের ঋণ দেওয়া টাকার মাত্র ১৩%-১৮% উদ্ধার হয়েছে। অর্থাৎ কর্পোরেটরা প্রতি ১০০ টাকা ঋণের বদলে সরকারি ব্যাঙ্কগুলোকে ফিরিয়েছে মাত্র ১৩-১৮ টাকা।
এই মকুব হওয়া ঋণের টাকা কিন্তু দেশের জনগণের গচ্ছিত অর্থের থেকেই দেওয়া। অনেক সময়ে সেটা ব্যবসা বিস্তারের জন্যে নয়, বরং শেয়ার বাজার থেকে নিজের বা অন্য সংস্থার শেয়ার কেনার জন্যে কর্পোরেটরা নিয়ে থাকে। অর্থাৎ জনগণের অর্থে তারা ফাটকাবাজি করে থাকে।
এর সাথেই বর্তমানে বন্ধ হয়ে যাওয়া মার্কিন সংস্থা হিন্ডেনবার্গ রিসার্চের তদন্তে প্রকাশিত হয়েছিল যে আদানি গোষ্ঠী নিজের শেয়ারের দাম কৃত্রিম ভাবে বাজারে বৃদ্ধি করে সেই শেয়ার বন্ধক রেখে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলোর থেকে ঋণ নেয়।
হিন্ডেনবার্গ আরও দেখিয়েছিল যে ভারতের শেয়ার বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা স্টক এক্সচেঞ্জ বোর্ড অফ ইন্ডিয়া বা সেবি আদানি এন্টারপ্রাইজের হয়ে পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ করেছে।
কিন্তু রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি, সরকারি জমি ও টাকা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে চিন্তিত বিজেপি কিন্তু আদানি এন্টারপ্রাইজের পক্ষেই দাঁড়ায়। মোদী সরকার কিন্তু আদানি বা তাঁর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বিরোধীরা এই নিয়ে মোদী সরকার ও আদানি গোষ্ঠীর মধ্যে আঁতাতের অভিযোগ বহুবার তুললেও, সরকারি ভাবে আদানি এবং তাঁর প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ করা হয়নি।
আদানি বা আম্বানিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে বিজেপি বলে “ব্যবসা বাঁচাতে হবে”। মোদী সরকার তাঁদের লগ্নিকারী ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী হিসাবে চিহ্নিত করে এবং তদন্তের থেকে রক্ষা করে। তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে পত্রপাঠ খণ্ডন করে থাকে। কিন্তু একজন হকার স্টেশনের পাশে দোকান বসালে রাষ্ট্র হঠাৎ “আইনের শাসন” আবিষ্কার করে। তখন সে বলে বেআইনী ভাবে ব্যবসা করা হচ্ছে।
এখানেই বিজেপির রাজনীতির শ্রেণিচরিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
একদিকে কর্পোরেট পুঁজির জন্য বিমানবন্দর, খনি, বন্দর, বনভূমি, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলোর ঋণ— সব খুলে দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, হকার, রিকশাচালক, ফুটপাতের দোকানদারদের “অবৈধ” তকমা দিয়ে শহর থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে, সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। শহরকে “স্মার্ট” করার নামে দরিদ্রদের অদৃশ্য করে দেওয়া হচ্ছে।
এই উচ্ছেদ অভিযানকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে ভুল হবে।
দশ বছর আগে হওয়া নোট বাতিল কর্মসূচি ভারতের সবচেয়ে বড় কর্ম সংস্থানের ক্ষেত্রকে—মধ্য, ক্ষুদ্র ও অতি ক্ষুদ্র সংস্থাগুলোকে বা এমএসএমই ক্ষেত্রকে—একটি জোরালো ধাক্কা দিয়েছিল। নগদের ভিত্তিতে কারবার করা কত এমএসএমই যে বাজার থেকে উঠে গেছিল, কত মানুষ কর্মহীন হয়েছিল সেই বিষয়ে কোনো সরকারি সমীক্ষা করা হয়নি। শুধু কালো টাকার বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন হয়েছে বলে নোট বাতিল কর্মসূচিকে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করেছিল বিজেপি। পরবর্তীতে দেখা গেছিল ব্যাঙ্কে সমস্ত নগদ টাকা ফিরে এসেছিল। কিন্তু এই তুঘলকি কর্মকান্ডে লক্ষ লক্ষ মানুষ পথে বসেন।
ঠিক তেমনি পণ্য ও পরিষেবা কর বা জিএসটি চালু করে মোদী সরকার ছোট ব্যবসার কার্যকরী মূলধন আটকে দিয়েছিল। কর্পোরেট রিটেল ও ই-কমার্স ছোট দোকানদারদের বাজার কেড়ে নিয়েছে। কোভিড-১৯ পর্যায়ের লক ডাউনের সময় ছোট ব্যবসাগুলো আরও বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়। মধ্যবিত্ত কুইক কমার্স ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে চলে গেলেও, গরিবের জন্যে কিন্তু ফুটপাথের বাজার তাও পণ্য ও পরিষেবা প্রাপ্তির একটি বড় জায়গা ছিল। এখন স্টেশন চত্বর ও ফুটপাত থেকেও হকারদের সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সেই প্রান্তিক মানুষেরা যাদের ক্রয় ক্ষমতা অত্যন্ত কম। অর্থাৎ অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির উপর ধারাবাহিক আঘাত চলছে।
ভারতের শহুরে অর্থনীতিতে হকাররা “সমস্যা” নয়; তারা অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। কলকাতায় কয়েক লক্ষ হকারের উপর লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন নির্ভরশীল। তারা সস্তায় জিনিস পৌঁছে দেয় শ্রমজীবী ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে। তাদের উচ্ছেদ মানে শুধু কয়েকটি দোকান ভাঙা নয়; স্থানীয় বাজার, ক্ষুদ্র অর্থনীতি ও জনতার ক্রয়ক্ষমতার উপর আঘাত।
বিজেপি আজ “এনক্রোচমেন্ট” বিরোধী রাজনীতি করছে। কিন্তু একই রাষ্ট্র কর্পোরেটদের জন্য হাজার হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের থেকে নেওয়া ঋণের টাকা মকুব করে, হাসদেও আরন্দ থেকে আরাভলি পর্বতমালা সহ দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ বেসরকারি হাতে তুলে দেয়। তখন “জনস্বার্থ” কোথায় যায়?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল— রেল স্টেশন পরিষ্কার করার নামে কি গরিবদের জীবিকা ধ্বংস করাই একমাত্র পথ? পুনর্বাসন কোথায়? বিকল্প বাজার কোথায়? লাইসেন্সিং ও সংগঠিত হকার জোন কোথায়?
কারণ বাস্তবতা হল, এই উচ্ছেদ অভিযান শহরকে শুধু “পরিষ্কার” করছে না; শহরকে গরিবহীন, কর্পোরেট-বান্ধব এবং নিয়ন্ত্রিত করে তুলছে।
যে বিজেপি একসময় “ছোট ব্যবসায়ী” ও “স্বনির্ভর ভারত”-এর কথা বলত, আজ সেই বিজেপির শাসনেই সবচেয়ে বেশি আঘাত আসছে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির উপর। আর দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সেই আঘাতের পক্ষেই হাততালি দিচ্ছেন বহু সাধারণ মানুষ— যারা নিজেরাও একই অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বাস করছেন।
প্রশ্ন তাই থেকেই যায়—রাষ্ট্র কি সত্যিই বেআইনি দখলের বিরুদ্ধে লড়ছে, নাকি শহরকে কর্পোরেট ভারতের জন্য পুনর্গঠন করছে?

